আস্থা বাড়াচ্ছে কক্সবাজারের প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র
অর্ধযুগ ধরে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছি। পরিত্রাণ পেতে শরণাপন্ন হয়েছি শহর-গ্রামের নানা চিকিৎসকের। কিন্তু কোথাও স্বস্তি মেলেনি। হাঁটা-চলা-নামাজ আদায়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়েছে রাত-দিন।
এলাকার এক ছোট ভাইয়ের কাছে সরকারি প্রতিবন্ধী সেবার কথা শুনে ছুটে আসা। টানা চিকিৎসাসেবার পর এখন দিব্যি আরামে হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে সব করতে পারছি। তাই নিজেই এখন বাত-ব্যথায় ভোগা স্বজন-প্রতিবেশী-পরিচিত জনদের সরকারি প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রে যেতে পরামর্শ দিচ্ছি।
সরকারি ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে’ চিকিৎসার পর পক্ষাঘাত থেকে মুক্তি পেয়ে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কক্সবাজার সদরের জালালাবাদ মিয়াজিপাড়ার সৈয়দ নুর (৫৫)।
শুধু সৈয়দ নুর নয়, কক্সবাজার পৌরসভার পেশকার পাড়ার শহিদুল্লাহ, রামুর খুনিয়াপালং এলাকার দুলাল মিয়া, চকরিয়ার বৃদ্ধা শাহেনা আকতারসহ অনেকেই এ সেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। সেই সঙ্গে তারা এই প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সুফল বর্ণনা করছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন পরিচালিত এই ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র’ সেবা দিচ্ছে। কক্সবাজারের শহরের বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের পাশে অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের ভবনের নিচতলায় রয়েছে কক্সবাজার শাখা কেন্দ্র।
৪ বছর আগে চালু হওয়া কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৩৩ হাজার ৭৮৫ জন প্রতিবন্ধী। ভ্রাম্যমাণ সেবা পেয়েছেন আরও এক হাজার ১৮৫ জন। ব্যবহার্য দ্রব্যাদি পেয়েছেন ৪৩৫টি। সপ্তাহের শনি থেকে বুধবার টানা সেবা দেয়া হয় এই কেন্দ্রে।
কক্সবাজার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপি) ডা. মো. মেহেদী হাসান বলেন, সাধারণত যারা শারীরিক এবং অন্যান্য অক্ষমতার জন্য কোনো কাজ করতে পারেন না তাদের আমরা প্রতিবন্ধী বা পক্ষাঘাত হিসেবে নির্ণয় করি। প্রথমে রোগী শনাক্ত এবং পরে শুরু হয় চিকিৎসা সেবা। এখানে অটিজম, শারীরিক-মানসিক-দৃষ্টিশ্রবণ এ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধীদের সেবা দেয়া হয়।
20170401161504.jpg)
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১২ সালের ৭ জুন। সেবার মান বৃদ্ধিতে গঠন করা হয়েছে জেলা ও উপজেলা স্টিয়ারিং কমিটি। যেখানে এলাকার জনপ্রতিনিধি-এনজিওকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ডা. মেহেদী হাসান বলেন, এ কেন্দ্র থেকে সেবা নিয়েছেন ৩৩ হাজার ৭৮৫ জন প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাত রোগী। তাদের মধ্যে পুরুষ ২০ হাজার ৫৬৩ ও নারী ১৩ হাজার ২২২ জন। এছাড়া মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে সেবা নিয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ জন।
তার ভাষ্য মতে, শুধু সেবা দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়নি। দেয়া হয়েছে ব্যবহার্য উপকরণও। এ পর্যন্ত ২৫৬টি হুইলচেয়ার, ৭৪টি হেয়ারিং, ৩০টি ওয়াকার, ২০টি ট্রাই সাইকেল, ৫৫টি সাদাছড়ি সেবাপ্রার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে বিনা মূল্যে।
কক্সবাজার সমাজ সেবা অধিদফতর সূত্র জানায়, জাতিসংঘের হিসাব মতে বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ লোক প্রতিবন্ধী। সে হিসাবে আমাদের দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধি রোগে ভুগছেন।
সমাজসেবা অধিদফতরের কক্সবাজার জেলার উপপরিচালক প্রীতম কুমার চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র। কাজ করছে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান। যা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ সেবা দিয়ে আসছে।
এদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, প্রতিবন্ধীদের শারীরিক, মানসিকভাবে সক্ষম করে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন বিনামূল্যে যুগোপযোগী সেবা কার্যক্রম চালু করেছে।
অটিজম বা প্রতিবন্ধী কিংবা পক্ষাঘাতে আক্রান্তদের যেকোনো ফ্রি সেবা নিতে প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রে আসার আহ্বানও জানান তিনি।
সায়ীদ আলমগীর/এএম/জেআইএম