প্রত্যন্ত গ্রামে একখণ্ড নারী রাজ্য
জামালপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বাজার পরিচালনা করছেন নারীরা। পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম আমখাওয়া গ্রামের এই নারীরা পুরুষ দেখলেই ঘোমটা টেনে চলতেন, স্বামীর নাম মুখে আনতেন না। অথচ আজ ব্যবসা থেকে শুরু করে বাজার পরিচালনা কমিটির সবকিছুর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা। বাজারটির দৃশ্যপট দেখে মনে হতে পারে পুরুষশাসিত সমাজে এ যেন একখণ্ড নারী রাজ্য।
দেওয়ানগঞ্জের সীমান্তবর্তী হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের পশ্চিম আমখাওয়া গ্রামের শেফালী বেগম। পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও স্বামীর সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজ করতেন তিনি। ওই সময় সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পুরুষ মানুষ দেখলেই লম্বা ঘোমটা টেনে চলতেন, প্রয়োজনে স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করলেও মুখে নিতেন না তার নাম।
সেই শেফালী বেগমই আজ আমখাওয়া বাজারে ব্যবসা করছেন। ব্যবসার টাকায় সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। শুধু তাই নয়, জমি কিনেছেন,বাড়ি করেছেন। বাজারের একটি দোকান থেকে করেছেন তিনটি দোকান।
একই বাজারে ব্যবসা করেন আনোয়ারা বেগম। বাল্য বয়সেই এক কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে তার বিয়ে দেয় পরিবার। অভাবের সংসার। তাই সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে নারী হিসেবে তিনিই প্রথম এই বাজারে ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় লোকজনের নানা রকম কথা শুনেও হাল ছাড়েননি তিনি। সফলও হয়েছেন।
শেফালী আর আনোয়ারাই নন, এ বাজারের আম্বিয়া, রুমা, কামিনা, মাজেদা সবাই যেন এক একটি সাফল্যের গল্প। আর এ সাফল্যের পেছনে কাজ করে যাচ্ছে গণচেতনা রি-কল নামের একটি এনজিও। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এনজিওটি পশ্চিম আমখাওয়া গ্রামের ১৮ নারীকে ব্যবসার ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে বাজারে দোকান করে দিয়েছিল। আর তাদের দেখে অন্য নারীরা নিজ উদ্যোগেই এ বাজারে দোকান দিয়েছেন। বর্তমানে আমখাওয়া বাজারের ৫০টি দোকানের ৩২টির ব্যবসায়ীই নারী। হোটেল, কসমেটিক্স, মনোহারি, লেপ-তোষক, কম্পিউটার-ফটোকপিসহ সবধরনের ব্যবসার সঙ্গেই জড়িত এই নারীরা।
আমখাওয়া বাজারের রুমা আক্তার বলেন, ‘আমি এই বাজারে কম্পিউটার-ফটোস্ট্যাটের দোকান দিছি। আমার স্বামীও পাশের আরেকটি বাজারে এইগুলার দোকান দিছে। আমি মানুষের ছবি তুলি, ছবি প্রিন্ট দেই, গান ডাউনলোড এবং ফটোকপি করি। দুজনের প্রতিদিন যা আয় হয় তাতে সংসার অনেক ভালোভাবে চলতাছে।’ 
কসমেটিক্স ব্যবসায়ী রিনা বলেন, ‘ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক স্বামীর একার রোজগারে কোনো রকমে সংসার চলছিল। বাজারে নারীদের ব্যবসা করতে দেখে পাঁচ বছর আগে এনজিওর অনুদান আর স্বামীর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আমিও ব্যবসা শুরু করি। এ ব্যবসা করে এখন জমি কিনে পাকা বাড়ি করেছি, স্বামীকে নতুন মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছি। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে ব্যাংকেও টাকা জমাচ্ছি, আমার সংসারে এখন কোনো অভাব নেই।’
আমখাওয়া বাজারের তিনটি হোটেলের মালিকও তিনজন নারী। নাছিমা, ছমিরুন আর জোস্না হোটেল ব্যবসা করে তাদের পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতাই শুধু ফিরিয়ে আনেননি, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি করেছেন। হোটেল ব্যবসায় এই তিন নারীকে সহায়তা করছেন তাদের স্বামী এবং সন্তানরা। আর এই সহযোগিতার জন্য তাদের মজুরিও দিচ্ছেন তারা।
আমখাওয়া বাজারের নারীরা শুধু ব্যবসাই করছেন না, বাজার পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বও দিচ্ছেন। সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামের এ বাজারটির সবকিছু নারী দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় ইতোমধ্যে নারী বাজার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
আমখাওয়া বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কনিকা পারভীন বলেন, বাজারের ব্যবসা থেকে শুরু করে কমিটি পরিচালনা সবকিছুই আমরা নারীরা করছি। তাই আমাদের বাজারটি এখন নারী বাজার হিসেবেই সবাই চেনে।
গণচেতনা রি-কল প্রকল্পের সমন্বয়কারী শ্যামল রায় জানান, যমুনার দুর্গম এলাকার নারীদের সাবলম্বী করতেই কাজ করা হচ্ছে। ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করতে হয় প্রথমে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার পর আর্থিক অনুদান দিয়ে এসব নারীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দেয়া হয়েছে।
প্রত্যন্ত গ্রামের এই আমখাওয়া বাজারটি তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আরএআর/এমএস