ধান কাটতে দক্ষিণে যাচ্ছেন উত্তরের মজুররা
হাতে কাস্তে, কাঁধে বাঁশের বাংকুয়া আর রোদ-বৃষ্টি মোকাবেলার জন্য মাথাইল। সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগে পুরনো সার্ট, লুঙ্গি গামছাসহ পরিধেয় কাপড়। কিছু শুকনা খাবার ও যৎসামান্য টাকা পয়সা নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মজুর এখন ধান কাটতে ছুটছেন দক্ষিণের চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। বাসের ভাড়া বেশি ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নিরাপদ বাহন হিসেবে ট্রেনকেই বেছে নিচ্ছেন মজুররা। সমবেত হচ্ছেন পার্বতীপুর রেল জংশনে। তবে ট্রেনগুলোতে যাত্রীবাহী কোচের সংখ্যা কম এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদকেই বেছে নিচ্ছেন মজুররা।
পার্বতীপুর কৃষি কর্মকর্তা আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবির বলেন, উত্তরাঞ্চলে এখনও পুরোপুরি ধান কাটা শুরু না হওয়ায় মজুররা বাড়তি রোজগার করতে কাজের সন্ধানে দক্ষিণের জেলাগুলোতে যাচ্ছেন। পার্বতীপুর রেল থানার ওসি একেএম লুৎফর রহমান বলেন, পার্বতীপুর চার লাইনের জংশন হওয়ার সুবাদে উত্তরের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার মজুররা বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে সমবেত হচ্ছেন পার্বতীপুর স্টেশনে। মজুরদের নিরাপত্তায় বাড়তি ব্যবস্থা নিয়েছে রেলপুলিশ। দলে দলে আসা মজুরদের টাকা পয়সা, ব্যাগ যাতে খোয়া না যায় কিংবা অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে না পড়ে তা দেখা হচ্ছে। মজুররা যাতে কারও দেওয়া কোনো খাবার না খান তার জন্য রেল জংশনে মাইকে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ যেন ঈদ কিংবা বিশ্ব ইজতেমা থেকে ঘরে ফেরার দৃশ্য।
পার্বতীপুর জংশনে অপেক্ষারত ৫৩ বছর বয়সী মোহসীন আলী জানান, তিনি এসেছেন রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থেকে। চুয়াডাঙ্গায় যাবেন ধান কাটতে। তার দলে আছেন ১৬ জন মজুর। নিজ এলাকায় ধান কাটা এখনও শুরু না হওয়ায় বের হয়েছেন মজুরি করতে। বাড়তি রোজগার করে ঘরে ফিরবেন তারা। ২০ দিনের মতো থাকতে পারলে একেকজন মজুর ৮ হাজার টাকা করে রোজগার করতে পারবেন বলে তিনি জানান। তবে ট্রেনের ভাড়া বেশি হওয়ায় টিকিট কাটতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের ঘুগরাতলীর আ. সালাম জানান, তারা ১৫ জন বের হয়েছেন ফেনী জেলার উদ্দেশ্যে। নিজ এলাকায় এখন হাতে কাজ নেই। ধারদেনা করে ১ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছেন। বাড়িতেও কিছু টাকা রেখে গেছেন স্ত্রী-সন্তানদের খাওয়ার জন্য। ফিরে এসে কর্জ পরিশোধ করবেন।
খুলনা মেইল ট্রেনের ছাদে থাকা ডোমারের সুরুজ আলী জানান, ভিড়ের কারণে তারা ট্রেনের ছাদে উঠতে বাধ্য হয়েছেন। তারা ১৩ জন যাবেন যশোরে। গৃহকর্তার ধান পাকলে প্রতি বছর মোবাইলে খবর পেয়ে দলবলে ধান কাটতে যান নির্দিষ্ট ঠিকানায়। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণে মজুরি বেশি পাওয়া যায়। খাওয়ার পরও ১ একর জমির ধান কাটলে ৪ হাজার টাকার বেশি দাম পাওয়া যায়। পার্বতীপুরের মন্মথপুর ইউনিয়নের রাজাবসরের গৃহিণী সালমা খাতুন বলেন, তার স্বামী দু`দিন আগেই নওগাঁ গেছেন। কাজ পেয়ে ধান কাটা শুরু করেছেন। বাড়িতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছেন তার স্বামী। মজুরি পেলে বিকাশের মাধ্যমে বাড়িতে টাকা পাঠাবেন।
এএইচ/এমএস