হামাগেরে মতো গরীবের মরেই যাওয়াই ভালো!
পেট্রলবোমার আগুনে পোড়ার তীব্র যন্ত্রনার চেয়ে বড় জ্বালা এই প্যাটের ক্ষুধা। বউ-বাচ্চা, পঙ্গু বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা’টাকে লিয়ে ক্যামনে বাঁচি। ওগেরে মুকে ঠিক মতো এক বেলা নুন-ভাতই তুলে দিবার পারি না, আর হামার চিকিৎসার খরচ কোত্থেকে যোগামু, তার চে হামাগেরে মতো গরীবের মরেই যাওয়াই ভালো।
এভাবেই বিড়বিড় করে বলে গেলেন জামায়াত-শিবিরের পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ জয়পুরহাট সদর উপজেলার বুলুপাড়া গ্রামের ট্রাক শ্রমিক শহিদুল ইসলাম।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার বুলুপাড়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম (৩৪) প্রায় ১২ বছর যাবত ট্রাকের কুলি শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা চালিয়ে আসছিলেন। এর আগে বাবা আজগর আলীও ছিলেন একই পেশায়। ১২ বছর আগে ট্রাক থেকে সরিষার বস্তা নামাতে গিয়ে পা মচকে মারাত্মক আহত হন। চিকিৎসার অভাবে আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি বৃদ্ধ আজগর। বরং এখন সেই পায়ে পঁচন ধরেছে। পরিবারের অভাব ঘোঁচাতে বাবার পেশা কুলি শ্রমিকের কাজ নেন শহিদুল।
এভাবে ভালোই চলছিল বলে তিনি আরো জানান, সহায় সম্বল বলতে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া এক শতকের বসত ভিটা। তাই তার এই সামান্য রোজগারে দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলের স্কুলের লেখাপড়ার খরচ, স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণ, বাবা-মা’র চিকিৎসা খরচসহ সব কিছুই এক রকম চলছিল।
এ অবস্থায় ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ আর হরতালের মধ্যে জীবিকার তাড়নায় বাধ্য হয়ে ট্রাকে উঠেন শহিদুল। গত ৮ এপ্রিল জয়পুরহাট থেকে রড বোঝাই ট্রাকটি জেলার শিরট্টি- চানপাড়া সড়কের ভুতগাড়ী নামক পৌঁছলে ২০/২৫ জন জামায়াত-শিবিরকর্মী পেরেক গাঁথা বেশ কয়েকটি তক্তা রাস্তায় বিছিয়ে ট্রাকের গতিরোধ করে। তারপর দুর্বৃত্তরা ট্রাকটিতে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করলে শহিদুল মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।
স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাকে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থান্তান্তর করা হয়। ঘটনার পরদিন জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক আব্দুর রহিম তার চিকিৎসা বাবদ ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে শহিদুল স্বীকার করে বলেন, ধার-দেনা করে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
আরো চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও নিরুপায় হয়ে তাকে বাড়ি ফিরে আসতে হয়। তারপর গাছ-গাছালীর লতাপাতাসহ কবিরাজী চিকিৎসা চললেও এখনও নিরাময় হয়নি তার পোড়া শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থান। শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যাওয়ায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন শহিদুল ইসলাম। ফলে তার পরিবারের সকলের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে।
শহিদুল ইসলামের স্ত্রী তাসলিমা বেগম জানান, প্রতিবেশি সুমি বেগম গতকাল এক কেজি চাল দিয়েছেন, তাই দিয়ে বাচ্চাদের খাইয়েছি। আজ আর কিছু নাই, বাচ্চাদের কি খাইতে দিমু। এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
প্রতিবেশী সুমি বেগম, আব্দুর রউফ রাসেল, আলম মিয়াসহ গ্রামবাসীরা শহিদুল ইসলামের পরিবারের এমন নিদারুন দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে জানান, এতদিন ধরে পাড়া প্রতিবেশিরা যে যা পারছেন সাহায্য করছেন। কিন্তু, এভাবে চলবে কত দিন? শহিদুলের পরিবার ও গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে থাকা অবস্থায় জেলা প্রশাসকের দশ হাজার টাকা ছাড়া আজ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো সহায়তা তো দূরের কথা কেউ খোঁজ-খবর পর্যন্ত রাখেননি।
জয়পুরহাট জেলা পরিষদ প্রশাসক এস এম সোলায়মান আলী জানান, এ ব্যাপারে শহিদুলের পরিবারের কাছে কোন আবেদন পাওয়া যায়নি। তবে জেলা পরিষদের তহবিল থেকে তাকে সম্ভাব্য সকল সাহায্য-সহযোগীতা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
কর্ম অক্ষম অসুস্থ ট্রাক শ্রমিক শহিদুলের চিকিৎসাসহ তার অসহায় পরিবারের পাশে দাড়াতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ সকল বিত্তবানরা এগিয়ে আসবেন এমন দাবি জয়পুরহাট ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নসহ এলাকাবাসীর।
এমএএস/আরআই