ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

জামালপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে বিচারক নেই : মামলার পাহাড়

প্রকাশিত: ০১:৩০ পিএম, ০৩ মে ২০১৫

বিআরএস রেকর্ডে ভুল সংশোধন করে ভূমি মালিকদের ভোগান্তি কমাতে ২০১৩ সালে গঠন করা জামালপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলার পাহাড় জমলেও স্থায়ী বিচারক না থাকায় উল্টো ভোগান্তির শিকার হচ্ছে ভূমি মালিকরা। বর্তমানে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে যিনি ভারপ্রাপ্ত বিচারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি আরো ৪টি আদালতের বিচারিক দায়িত্বে রয়েছেন।

আর আদালত থেকে মামলায় লম্বা লম্বা তারিখ দেওয়ায় ভূমি মালিকরা রেকর্ড সংশোধন মামলা করলেও এখনো পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতিই হয়নি। আইনজীবীরা মনে করেন ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে যে পরিমাণ মামলা বিচারাধীন রয়েছে স্থায়ীভাবে বিচারক থাকলেও তা অর্ধশত বছরেও মামলা নিস্পত্তি করা সম্ভব হবেনা।


বিভিন্ন সরকারের সময়ে করা বিআরএস জরিপে পর্চা এবং ম্যাপে রয়েছে অসংখ্য ভুল। জমি পর্চায় আছে তো ম্যাপে নেই, ম্যাপে আছে তো পর্চায় নেই। আবার ম্যাপে থাকলেও বছরের পর বছর ধরে যে চৌহুদ্দিতে মালিক জমি ভোগ-দখল করে আসছে সেভাবে নেই। ইতোমধ্যেই রেকর্ড সংশোধনের কয়েকটি ধাপ নীরবে চলেও গেছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টাউট-বাটপাড় আর মাঠ পর্যায়ের জরিপ কর্মকর্তাদের পোয়াবারো অবস্থা। ফলে জমি ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও ভোগ দখলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে ভূমি মালিকদের। বিআরএস রেকর্ডে অসংখ্য ভুল থাকায় রেকর্ড সংশোধন করে ভূমি মালিকদের ভোগান্তি লাঘবের জন্য সারাদেশে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালত গঠন করে সরকার। এসব ট্রাইব্যুনালে যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারকসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়ার কথা।

২০১৩ সালে রেকর্ড সংশোধনের জন্য জামালপুরেও গঠন করা হয় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালত। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর অন্যান্য জনবল কিছু নিয়োগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি, যে কারণে শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়েই চলছে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম।

এছাড়াও আলাদা কোনো এজলাস এবং সেরেস্তা কোনটিই দেওয়া হয়নি ট্রাইব্যুনালের জন্য। অথচ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৩৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এবং চলতি বছরের ৭ জুলাই পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে রেকর্ড সংশোধন মামলা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে জামালপুর যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতের বিচারক মো. ইমদাদুল হক ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন।

ওই বিচারক তার নিজের আদালত যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত ছাড়াও যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালত, অর্থঋণ আদালত, অর্পিত সম্পত্তি আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একজন মাত্র বিচারক একাই ৫টি আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলার কার্যক্রমে কোনো অগ্রগতিই হয়নি।


এদিকে ভূমি রেকর্ড সংশোধন মামলা করলেও ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত স্থায়ী বিচারক না থাকায় বার বার তারিখ নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে ভূমি মালিকদের। এতে করে তাদের অর্থ এবং সময় দু’ই নষ্ট হচ্ছে। আর আদালত থেকে দীর্ঘ দীর্ঘ তারিখ দেওয়ায় মামলারও কোনো অগ্রগতি হচ্ছেনা।

জামালপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে বিআরএস রেকর্ড সংশোধন মামলার বাদী ইসলামপুর উপজেলার ঝগড়ারচর কড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা মো. গোলাম মোস্তফা জাগো নিউজকে জানান, জমির রেকর্ড কারেকশনের জন্য ২০১৩ সালে তিনি মামলা করেছেন। মামলার দায়ের পর প্রায় তিন বছর হতে চললেও শুধুমাত্র তারিখই পড়েছে, এখনো পর্যন্ত তার মামলার কার্যক্রমই শুরু হয়নি। এতে করে তার শুধু আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছেনা, তার সাংসারিক কাজকর্মেও ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় একই রকম কথা জানালেন, সদর উপজেলার বাঁশচড়া ইউনিয়নের বৃদ্ধ গিয়াস উদ্দিন। মামলার তারিখ থাকায় আদালতে এসেছেন, কিন্তু এসে দেখেন আদালত থেকে আবারো মামলার তারিখ দেওয়া হয়েছে। আগামী তারিখেও মামলার কার্যক্রম শুরু করা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তার।

আইনজীবীরাও মনে করেন একাধিক কোর্টের দায়িত্বে থাকা একজন মাত্র বিচারের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের মামলা নিস্পত্তি করা দূরহ ব্যাপার। যে কারণে বিচার প্রার্থীরা বার বার আদালতে এসে ফিরে যাচ্ছে, আর এতে করে বিচার প্রার্থীরা ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করতে হলে প্রতিটি থানায় একজন করে বিচারক দিয়ে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

এছাড়াও ট্রাইব্যুনালে মামলা নিস্পত্তি হবার পর আপিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে হাইকোর্টকে। অল্প পরিমাণ জমির জন্য হাইকোর্টে আপিল করাটাও জেলা পর্যায়ের বিচারপ্রার্থীদের জন্য কষ্টকর। এক্ষেত্রে আপিলের ক্ষমতা জেলা জজকে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ স্ব স্ব জেলা থেকে আপিল মোকদ্দমা ফল ভোগ করতে পারবে। এতে করে বিচারপ্রার্থীদের সময় এবং ভোগান্তি দু’ই হ্রাসপাবে।

জামালপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. খাজা নাজিম উদ্দিন জাগো নিউজকে জানান, বর্তমানে প্রায় এগারো হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অথচ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে এখনো বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নিৎ। যে কারণে ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে মামলা কার্মক্রম চলছে। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে লম্বা তারিখ পড়ছে আর বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।


জামালপুর জজ আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আলী জাগো নিউজকে বলেন, জামালপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর স্থায়ী বিচারক না থাকায় এখন পর্যন্ত একটি মামলারও নিস্পত্তি হয়নি। আর যে পরিমাণ মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে স্থায়ীভাবে বিচারক থাকলেও তা অর্ধশত বছরেও নিস্পত্তি করা সম্ভব হবেনা বলে মনে করেন তিনি।

এ ব্যাপারে জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ এস.এম. জামাল আব্দুন নাসের জাগো নিউজকে জানান, একজন মাত্র বিচারক ৫টি কোর্টের দায়িত্ব পালন করছেন, যে কারণে অন্যান্য দায়িত্ব পালন করে তার একার পক্ষে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো প্রতিটি উপজেলার সহকারী জজদের কাছে বিচারের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলে মামলা দ্রুত নিস্পত্তি হতো এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের একটি সংশোধনীই যথেষ্ঠ বলে মনে করেন তিনি। আর এতে করে মামলা দ্রুত নিস্পত্তি হয়ে মানুষ ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই পাবে।

এমএএস/আরআইপি