কৃষককে থানায় দিয়ে তার জমিতে রাস্তা নির্মাণ
বগুড়ার শাজাহানপুরে কৃষককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে চুরির মিথ্যা অভিযোগে থানায় দিয়ে জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। বৃদ্ধ কৃষককে পেটানো ও জমি দখলের নায়ক হলেন শাজাহানপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি ও স্থানীয় খোট্রপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ আল ফারুক। প্রভাবশালী এই চেয়ারম্যান আবার জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি একেএম আছাদুর রহমানের ভাগিনা।
ঘটনার শিকার বৃদ্ধ কৃষক মন্তেজার রহমান সরকারের (৬৫) ছেলে মিলন সরকার অভিযোগ করে বলেন, শাজাহানপুর থানা পুলিশের ওসি আবদুল্লাহ আল মাসউদ চৌধুরী ঘটনাটি তদন্ত না করেই তার বৃদ্ধ বাবাকে সারারাত থানা হাজতের বারান্দায় বসিয়ে রাখে। শনিবার বেলা ১১টায় ঘটনাটি সাংবাদিকরা জানতে পারলে তিনি তখন লোক দেখানো তদন্তের জন্য একজন এসআইকে তাদের গ্রামে পাঠায়।
অভিযোগ উঠেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের জুসখোলা গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক মন্তেজার রহমান সরকার (৬৫) স্থানীয় মোস্তাইল বাজারে চা খেতে আসেন। এসময় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবদুল্লাহ্ আল ফারুক এবং একই ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য হায়দার আলী ওই বৃদ্ধকে প্রকাশ্যে মারধর করেন। এরপর ইউনিয়ন পরিষদে ধরে এনে নন জুডিশিয়াল তিনটি স্ট্যাম্পে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেন। শেষে যে পুরোনো বাইসাইকেল নিয়ে ওই কৃষক বাজারে এসেছিলেন নিজের সেই সাইকেলটি চুরির অভিযোগে চৌকিদার দিয়ে বৃদ্ধ মন্তেজারকে থানায় সোপর্দ করেন।
থানায় আটক বৃদ্ধ কৃষক মন্তেজার বলেন, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে আবদুল্লাহ্ আল ফারুক ভোটের বিনিময়ে জুজখোলা-কানিপাড়া এলাকার লোকজনকে রাস্তা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আমার পৈত্রিক মালিকানা আবাদি জমি দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিছুদিন আগে জোর করে নলকুপ বসানো ও জমির বোরো খেত মাড়িয়ে জায়গা দখল করে ইট বসিয়ে মোস্তাইল-জুজখোলা সড়ক থেকে জুজখোলা কানিপাড়া পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন ইউপি চেয়ারম্যান।
এরপর তিনি জায়গা দখলের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বগুড়ার জ্যোষ্ঠ সহকারী জজ আদালতে অভিযোগ করেন। অভিযোগে চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ্ আল ফারুক ও ইউপি সদস্য হায়দার আলীসহ পাঁচজনকে বিবাদী করা হয়।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালত বিবাদীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। বৃহস্পতিবার সমনের নোটিশ পেয়ে ক্ষিপ্ত হন ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য। এরপরই চেয়ারম্যান ফারুক ও ইউপি সদস্য হায়দার আলী তাকে প্রকাশ্যে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় মেরে নিজের সাইকেলই চুরির অপবাদ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন।
কৃষক মন্তেজার রহমান সরকারের ছেলে মিলন সরকার জানান, আমার বাবাকে পুলিশ থানায় আটকে রাখার সুযোগে শনিবার সকালে ইউপি চেয়ারম্যান তার লোকজন দিয়ে আদালতে সমনজারি করা জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেন। গ্রামের মানুষ এসব দেখলেও চেয়ারম্যানের সঙ্গে ক্যাডার বাহিনী থাকার কারণে ভয়ে কেউ বাধা দেয়নি।
অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবদুল্লাহ্ আল ফারুক কৃষককে মারধরের কথা স্বীকার করে বলেন, সাইকেল চুরি করায় তাকে দুই-চারটা থাপ্পড় মেরে চৌকিদার দিয়ে থানায় সোপর্দ করেছি। তবে ইউনিয়ন পরিষদে এনে ভয়ভীতি দেখিয়ে নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক কোনো স্বাক্ষর নেইনি। তাছাড়া থানায় আটকে রেখে তার জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগও সত্যি নয়। কে করেছে সেটাও জানি না।
ওই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম জানান, মন্তেজার এলাকার অবস্থা সম্পন্ন কৃষক। ভালো লোক হিসেবে তার সুনাম আছে। যে সাইকেল চুরির কথা বলা হচ্ছে কমপক্ষে ২০ বছর ধরে তাকে ওই সাইকেল নিয়ে পথেঘাটে চলাফেরা করতে দেখিছি। সাইকেল দিয়ে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় সোপর্দ করা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।
শনিবার দুপুর একটার দিকে শাজাহানপুর থানায় গিয়ে দেখা গেছে, থানার মাঝখানে সার্ভিস ডেলিভেরি শেডে গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছেন বৃদ্ধ মন্তেজার রহমান।
তিনি বলেন, শুক্রবার সারাদিন জমির ধান কাটার পর আটি বান্দিচি। সকালে অল্পএ্যানা পান্তা খাচি। মাগরিবের নামাজের পর মোস্তাইল বাজারত যাচ্চুনু চা খাবার। বাজারত যেই পৌঁচিচি, চিয়ারম্যান ফারুক হঠাৎ করে আসে হামার দু`গালত চর মারবার শুরু করল। এরপর হায়দার মিম্বার। কয়, শালা কেস করা তোর বার করিচ্চি। সারাদিনের না খাওয়া শরীল। অপমানে বেহুশ হয়ে পড়ি। পরে মাথায় পানি ঢাললে জ্ঞান ফিরে।
মানুষজনের সামনে এতগুলা চর খ্যায়া হামার কলজডা ফ্যাটে যাচ্ছিল। খালি হামি পানি খাবার চাচ্চি। এরপর ইউনিয়ন পরিষদে ধরে লিয়ে গেল। লাঠিহাতে ভয় দেকায়ে একশ টেকার তিনডা স্ট্যাম্পত সই লিল। এরপর চৌকিদার বক্কর এবং মান্নানকে দিয়া থানাত দিল। সারারাত থানাত বসে থাকনো। খবর প্যায়া বড় বেটা একনা ডিম লিয়ে আসলো, সেকনা খ্যায়া আচি। একন শুনিচ্চি হামার পুরানো সাইকেলডা হামি নাকি চুরি করিচি। এই বয়সে এই অপবাদ সমো ক্যামনে?’
শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মাসউদ চৌধুরী বলেন, একটি পুরোনো বাইসাইকেলসহ রাতে মন্তেজার নামে ওই লোককে চৌকিদারের মাধ্যমে খোট্রাপাড়ার চেয়ারম্যান থানায় সোপর্দ করেন। চেয়ারম্যান জানিয়েছেন তিনি সাইকেল চোর। অভিযোগ তদন্তে থানার উপপরিদর্শক কালাচাঁদ ঘোষকে পাঠানো হয়েছে। তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে কিনা তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লিমন বাসার/এফএ/জেআইএম