মুড়ি তৈরির অনন্য গ্রাম নারান্দিয়া
ইফতারে যেন মুড়ি অত্যাবশ্যকীয়। মুড়ির চাহিদা সারাবছর থাকলেও রোজার সময় এর উৎপাদন আর বিক্রি বেড়ে যায় বহুগুণ। এই মুড়ি তৈরির জন্য অনন্য গ্রাম টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়ন। মুড়ি উৎপাদনের সঙ্গে নারান্দিয়ার মানুষ অনেক আগে থেকেই জড়িত।
এ ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামের উল্লেখযোগ্য ব্যবসার মধ্যে স্থান পায় এই মুড়ি। সুস্বাদু মুড়ি তৈরির জন্য এ এলাকার পরিচিতি রয়েছে দেশজুড়ে। তাই এ এলাকার মুড়ি ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকেন রমজান মাসের। অনেকে আবার সিজনাল ব্যবসা হিসেবে এই মাসে মুড়ি উৎপাদন আর বিক্রি করে থাকেন।
টাঙ্গাইলসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় নারান্দিয়ায় তৈরি মুড়ি সরবরাহ হয়। হাতে ভেজে ও মেশিনের সাহায্যে মুড়ি উৎপাদিত হয়। জেলার সবচেয়ে বেশি মুড়ি উৎপাদনের এলাকা এই নারান্দিয়া থেকে রমজান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ লাখ টাকার মুড়ি বিক্রি হচ্ছে।
তবে মেশিনের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ মুড়ি প্রতিনিয়ত উৎপাদিত হলেও এ এলাকার হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা এখনও অপরিবর্তিত। মেশিনে ভাজা মুড়ি সাদা ও লম্বা করতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ইউরিয়া কিংবা সোডা ব্যবহারের অভিযোগ থাকায় এক শ্রেণির ক্রেতা সর্বদাই বিষমুক্ত হাতেভাজা মুড়ি খেয়ে থাকেন।
জানা যায়, নারান্দিয়া ইউনিয়নের নগরবাড়ীতে ২টি, দৌলতপুরে ২টি মোট ৪টি মিলে ৫টি মেশিনের সাহায্যে মুড়ি ভাজা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, এখানে ৪টি মিলের মেশিনে আর শতাধিক বাড়িতে হাতে ভেজে উৎপাদিত হচ্ছে মুড়ি। এখানে মেশিনের সাহায্যে মুড়ি উৎপাদন নতুন সংযোজন হলেও বহু পরিবার অনেক আগে থেকেই হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি এবং বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বিশেষ করে এ এলাকার মোদক সম্প্রদায়।
কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া, মাইস্তা, নগরবাড়ী, দৌলতপুর, লুহুরিয়া ও সিংহটিয়াসহ প্রায় পনেরটি গ্রামের কয়েকশ পরিবার হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি করে থাকেন। এদের একজন ১ দিনে এক থেকে দেড় মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারেন। প্রতি মণ চালে ২২ থেকে ২৩ কেজি মুড়ি হয়। প্রতি কেজি মুড়ি পাইকারি ৭০-৮০ টাকা এবং খুচরা ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মূলত গ্রামের নারীরাই হাতে ভেজে গুণগত মানসম্মত এই মুড়ি তৈরি করে থাকেন।

সততা মুড়ি মিলের স্বত্তাধিকারী শংকর চন্দ্র মোদক বলেন, ৫০ কেজি চালের বস্তায় ৪৪-৪৫ কেজি মুড়ি হয়। প্রতি কেজি মুড়ি আমরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করি। পাইকাররা আবার সেই মুড়ি প্রতি কেজি কমপক্ষে ৬৫-৭৫ টাকা দরে খুচরা বিক্রি করেন। রমজান মাসে প্রতিদিন ৫টি মিলে ১৫০ বস্তারও বেশি চালের মুড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ৬ লাখ টাকার মেশিনে ভাজা মুড়ি প্রতিদিন কেনাবেচা হয় এই এলাকায়।
তাদের দেয়া তথ্যমতে, এখানে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকার হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন এবং কেনাবেচা হয়। তবে পরিশ্রমে লাভের বেশির ভাগই চলে যায় মধ্যসত্তভোগীদের পকেটে। রমজান মাসে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা পিকআপ, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে বস্তাভর্তি মুড়ি কিনে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এলাকায় বিক্রি করেন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, বগুড়া, শেরপুর ও গাজীপুরে নারান্দিয়ার মুড়ি সরবরাহ হয়।
লোকনাথ মুড়ির মিলের স্বত্তাধিকারী সুনিল চন্দ্র মোদক বলেন, আমরা অনেক সময় মোবাইলেও মুড়ির অর্ডার নিয়ে সরবারহ করে থাকি। তাছাড়া নির্দিষ্ট বাজারে স্থায়ী গ্রাহকরা মুড়ি ক্রয় করে থাকেন।
তবে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা। মেশিনে মুড়ি ভাজতে সময় কম লাগে কিন্তু তুলনামূলকভাবে লাভ বেশি। অন্যদিকে হাতে মুড়ি ভাজতে সময় বেশি লাগে কিন্তু লাভ সামান্য। ফলে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা দিনদিন এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছেন। অনেকে আবার চলেও গেছেন। এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনকারী এবং ব্যবসায়ীরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসার উদ্দিন বলেন, হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা অনেক সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত। তাই উপজেলা পরিষদের আগামী ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেট থেকে নারান্দিয়া এলাকার হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারী ব্যক্তি এবং পরিবারগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
এ প্রসঙ্গে কালিহাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশের মধ্যে মুড়ি উৎপাদনের অন্যতম স্থান কালিহাতীর নারান্দিয়া। এখানকার উৎপাদিত লাখ লাখ টাকার মুড়ি সারাদেশে সরবরাহ হচ্ছে।
এটি এক প্রকার কুটিরশিল্প। মানুষের চাহিদা পূরণে ও এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে হাতেভাজা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। কালিহাতী উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এফএ/জেআইএম