ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

কাকরোলের গ্রামে চাষিদের দুর্ভোগ

প্রকাশিত: ০৭:১৩ এএম, ১৭ মে ২০১৫

নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদীর শীবপুর, রায়পুরা ও বেলাবো উপজেলার মধ্যে রায়পুরাতেই কাকরোলের ফলন বেশী। গ্রামের পর গ্রাম, মাইলের পর মাইল যতদূর চোখ যায় শুধু কাকরোলের মাচা চোখে পড়বে। সারা দেশে যত কাকরোল কেনা-বেচা হয় তার সিংহভাগই আসে এসব এলাকা থেকে। চাষাবাদ ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জীবন-জীবিকা সব কিছুই এখানে কাকরোল কেন্দ্রিক। এসব এলাকা কাকরোলের গ্রাম বলেই পরিচিত।

কাকরোল বর্ষাকালীন সবজি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। পুষ্টিগুণে ভরপুর এ সবজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এর উৎপাদন। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর ৫টি উপজেলা জুড়ে ফলছে বর্ষাকালীন এ সবজি। তবে বর্ষার আগেভাগেই নামে এ সবজি। পৃথক ৫টি উপজেলায় প্রায় ৪৫টি গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে আছে কাকরোলের মাচা। ঠিক কবে থেকে এ অঞ্চলে কাকরোলের চাষ হচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না এই অঞ্চলের প্রবীণরাও। তবে শুধু অনুমান করে বলে থাকেন, কম করে হলেও ২শ বছর আগে এসব এলাকায় কাকরোল চাষ শুরু হয়। হালে এর ব্যাপক চাষ শুরু হয়েছে।  

দুই জেলার ৪৫টি গ্রামের দেড় হাজার পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ এখন কাকরোল চাষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে তাদের দিন কারো এখন ভালো যাচ্ছে না। আষাড়-শ্রাবণ-ভাদ্র এ তিন মাস কাকরোলের জমজমাট ব্যাবসা চলে। তবে এখন এ সবজি বৈশাখ মাসের শুরু থেকেই মিলে। চাষের সময় তিন মাস হলেও এরপরও খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলে আরও ৩ মাস । এ কয় মাসের আয় দিয়েই তাদের চলতে হয় পুরো বছর। তবে যা আয় হয় তা মন্দ নয়। দাম ভালো পাওয়ায় আনেকেই এখন কাকরোল চাষে স্বচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন।

টানা তিন মাস চলে কাকরোলের ব্যবসা এরপর আরও ৩ মাস অপরিপক্ক কাকরোল জমি থেকে পাওয়া যায়। তা দিয়ে টুকটাক সংসারের খরচ চলে কৃষকদের। নরসিংদী উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর শিবপুর, বেলাবো ও রায়পুরা উপজেলায় প্রায় দেড় কোটি টাকার কাকরোল ফলে এই ৩ উপজেলায়। নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং আড়াই হাজারে ৫০ লাখ টাকার কাকরোল উৎপাদন হয়। এ হিসেবে এখানে ১ হাজার ৫শ পরিবার সাড়ে ৫ হাজার বিঘা জমিতে এ কাকরোলের চাষ করছেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকদের দেয়া হিসেব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে গড়ে ১০ মণ কাকরোল উৎপন্ন হয়। মণ প্রতি গড় মূল্য ৭ শ ৫০ টাকা হিসেবে ৫০ হাজার মণ কাকরোলের বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকারও বেশী। মৌসুমের শুরুতে দাম খানিকটা চড়া থাকলেও পরে তা নিচে নেমে আসে ।

অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রোগের প্রাদুর্ভাব প্রভৃতি কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাকরোল চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে । মরজাল এলাকার কাকরোল চাষি আমজাদ মিয়া (৪০) জাগো নিউজকে বলেন, আমগো দুঃসংবাদ হুইন্না আর কি অইব; কেডা আমাগো খবর লয়। উপজেলায় কৃষি অফিস আছে হুনছি, ফিল্ড অফিসারও নাকি আছে ভুরিভুরি। কিন্তু কেউ একবারও চুপি দিয়াও দেহে না। কৃষি ঋণ পায় বড় লোহে আমগার খবর কেডা রাহে।

কৃষকদের ঠকাতে পাইকাররা সব সময়ই বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। হাটে আগত পাইকররা প্রথমে জোটবদ্ধ হন। তারা প্রতি হাটের জন্য নির্দিষ্ট দর নির্ধারণ করে দেন। এ দরের বাইরে কোন পাইকার যান না। তাদের দেয়া অঘোষিত দরেরই হাটে কাকরোল বেচা-কেনা চলে। এ কৌশলে কৃষক ক্রেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। নানা পরিস্থিতির মুখে তারা বেশী মূল্যের কাকরোল কম দামেই বেঁচে দিতে বাধ্য হন।

পাইকাররা তাদের কাছ থেকে ৫/৬শ টাকা দরের কাকরোল কিনে তারা ঠিকই ১হাজার /১২ শ টাকায় বিক্রি করছেন। কৃষকরা কৃষি অফিসগুলো থেকে তেমন কোন সহায়তা পান না। পর্যাপ্ত মাঠ সুপারভাইজার থাকলেও তারা কালেভদ্রেও গ্রামের কৃষকদের খোঁজখবর রাখেন না।

সরেজমিনে গত রোববার রায়পুরা কৃষি অফিসে গেলে উল্লেখযোগ্য কাউকে না পেয়ে ফিরে আসতে হয়। শিবপুর কৃষি অফিসে গেলে তারা কাকরোল চাষের ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেননি। বেলাবো কৃষি অফিস কৃষকদের কাকরোল চাষে পরামর্শ ও সহযোগিতার কথা বললেও কৃষকরা বলেছেন ভিন্ন কথা। তারা জানান, কৃষি অফিসে কেউ গেলে তাদের সঙ্গে দুর্বব্যহার করা হয়।
     
দেশের সর্ববৃহৎ কাকরোলের হাট জমে গায়নপুরে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার আধা কিলোমিটার জুড়ে শুধু চোখে পড়ে কাকড়োলের সবুজ সমারোহ। বিশাল হাট জুড়ে কৃষকরা কাকরোলের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন। পাইকাররা কাকরোল কেনায় ব্যস্ত। রাস্তার ধারেই চলছে ট্রাক বোঝাইয়ের কাজ।

কুমিল্লা থেকে  হাটে আগত আব্দুর জব্বার ব্যাপারি জাগো নিউজকে জানান, তিনি ২ ট্রাক কাকরোল কিনেছেন। ১ ট্রাক তিনি কুমিল্লায় নিজ আড়তে ও অন্য ট্রাকটি পাঠাবেন রাজধানীর সায়েদাবাদে। লাভের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, মাশাল্লাহ খেয়ে পড়ে বেশ ভালই চলে আমার। অন্যদিকে, কৃষকরা বলেন, সারা বছর ধরে কষ্ট করি আমরা আর লাভের মোটা অংশ নিয়ে নেন মহাজন আর ফঁড়িয়ারা।

আশা-হতাশার দোলায় দুলছে কাকরোল চাষিরা। তাদের কথা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তারা পাচ্ছেন না। পেলে ঠিকই তাদের ভাগ্য ঘুরিয়ে নিতে পারতেন তারা। জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে আশ্বাস দেন ঠিকই কিন্তু নির্বাচনের পর কেউই তাদের খবর রাখেন না।

মীর আব্দুল আলীম/এমজেড/এমএস