অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটার রাখাইনরা
কুয়াকাটার উপকূলীয় এলাকার অলঙ্কার খ্যাত রাখাইন সম্প্রদায় ভুগছে অস্তিত্ব সংকটে। সেকালের রাখাইনরা একালে নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়েছে। চাষের জমি বেদখল, হামলা-মামলা, অন্যায়, অবিচার, বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে এ সম্প্রদায়টি। ফিরে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারে।
এ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়ের ৫০ হাজারের বেশি জনগোষ্ঠী থেকে দিন দিন কমে এখন ৪ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ সম্প্রদায়টি। হয়তো এমন একদিন আসবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শুধু কাগজপত্রেই এ অঞ্চলের রাখাইন সম্প্রদায় সম্পর্কে জানতে পারবে। তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে এমনটাই আশঙ্কা করেছে বিশিষ্টজনরা।
এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে বলে কুয়াকাটায় বসবাসরত বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাখাইন সমাজপতিরা দাবি করেছেন। তাদের মতে, জন্মসূত্রে ও পরিচয়গত ভাবে রাখাইনরা বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে আজও তারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিজ ভাষাসহ সাধারণ শিক্ষায় রাখাইনরা অনগ্রসর ও পশ্চাপদ।
-05-20170809174352.png)
রাখাইন শিশুরা বা-মায়ের কাছ থেকে নিজস্ব ভাষা আয়ত্ব করে কথা বলতে পারলেও তারা লিখতে-পড়তে পারে না। কারণ তাদের নিজস্ব ভাষা শিক্ষার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই। প্রধান জনগোষ্ঠী বাঙালি সমাজের একশ্রেণির লোকদের ভূমিগ্রাসের হীন তৎপরতায় রাখাইনরা প্রতারিত ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে দিনের পর দিন। ফলে কৃষি জমি হারিয়ে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দারিদ্র ক্রমশ ঘিরে ধরেছে তাদের।
সূত্র মতে, দেশ ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে একটি কুসংস্কারও। রাখাইন সম্প্রদায়ের অনেকেই বিশ্বাস করে তাদের বসবাসের আশেপাশে যখনই নদীগুলো ভরাট হবে এবং আরাকান ভূখণ্ড হতে এ অঞ্চলে আগমনের মেয়াদ দু’শত বছর (১৭৮৪-১৯৮৪) অতিবাহিত হবে তখন আর এ অঞ্চলে তাদের বসবাস করা উচিত নয়। এরপরও কেউ বসবাস করলে তাদের ওপর নেমে আসবে নানা রকম দুর্যোগ ও বিপদ এমন বিশ্বাস রাখাইনদের পূর্ব পুরুষ থেকে চলে আসছে। এই কুসংস্কার এ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইনরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করছে।
কুসংস্কারের বিষয়ে প্রবীণ রাখানইন সমাজপতি বাবু মংনান্ট তালুকদারের একটি লেখা থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইনদের একটি অংশ কুসংস্কার বিশ্বাস করে বিধায় কিছু সংখ্যক রাখাইন দেশ ত্যাগ করেছেন।
এ সম্প্রদায়টি শুরুর দিকে দেশের দক্ষিণ-প্রান্তসীমার শেষ ভূখণ্ড পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া ও গলাচিপা উপজেলা এবং বরগুনা জেলার বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলার সমুদ্র উপকূল জুড়ে রাখাইন জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। পরবর্তীতে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলে তারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতি স্থাপন করে। বিশেষ করে সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটার আশপাশের গ্রামগুলো এখনও রাখাইনরা স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে।
-04-20170809174344.png)
এ ব্যাপারে রাখাইন সমাজপতি ও রাখাইন বুড্ডিষ্ট ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বাবু উথাচিন মাতুব্বর জানান, ৫০ থেকে ৬০ দশক জুড়ে এ এলাকায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে অসংখ্য মানুষ মারা যায় এবং বন্যা পরবর্তী সময়ে কিছু সংখ্যক লোক দেশ ত্যাগ করেছেন। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের দখলীয় জমির দলিলপত্র হারিয়ে গেলে এই সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভূয়া দলিল সৃষ্টি করে জমি দখলে নেয়। পরবর্তীতে আর্থিক অভাব অনটনের কারণে অনেকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন সরকার এসব ভূমি দস্যুদের কঠোর হাতে দমন করলে রাখাইনরা হারানো অস্তিত্ব ফিরে পাবে।
রাখাইনদের অস্তিত্ব সংকটের ব্যাপারে কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও অনলাইন সাগরকন্যা পত্রিকার সম্পাদক নাসির উদ্দিন বিপ্লব বলেন, এ অঞ্চলের বসবাসরত রাখাইনরা তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি সংকটে ভুগছে। তাছাড়া এ এলাকার জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় ভূমি দস্যুদের প্রতারণার কবলে পড়ে তাদের জমি বেহাত হচ্ছে। ফলে তারা এখানকার জমি বিক্রয় করে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়নমারে কম দামে জমি কিনতে ছুটছে। তাই নিজেদের শেষ অবস্থা রক্ষায় তারা ধীরে ধীরে দেশ ছাড়ছেন।
এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম সাদিকুর রহমান বলেন, এ অঞ্চলে বসবাসকারী রাখাইনরা কোনো সমস্যায় পড়লে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা করছে।
এমএএস/জেআইএম