খেয়ে না খেয়ে লালনকে আঁকড়ে আছেন তারা
`মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি......., কবে সাধুর চরণ ধুলি মোর লাগবে গায়............, কবে দয়ার চাঁদ আসিয়া মোরে পার করে নে.......` লালন সঙ্গীতের চরনগুলি কত যুগ ধরে চলে বাংলার মানুষের কণ্ঠে ভেসে বেড়ায়। আর প্রতিনিয়ত এ সঙ্গীতকে ধরে রাখার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন লালন অনুরাগীরা। বর্তমান সময়ে যন্ত্র সঙ্গীতের সুরে হারিয়ে যেতে বসেছে একতারা-দোতারা, জুরি, হারমোনিয়াম আর ঢোল-তবলা দিয়ে গাওয়া লালন সঙ্গীত।
নওগাঁ সদরের শৈলগাছী ইউনিয়নের রামরায়পুর গ্রামে প্রায় শতাধিক লালন শিল্পী আছেন। লালন গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন তারা। বছরে চৈত্র এবং জৈষ্ঠ এ ২ মাস গান গেয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে সারা বছর কষ্ট করে চলতে হয় তাদের। শিল্পী জীবনের এ দুর্দশার গল্পে লালন সঙ্গীতকে ধরে রাখতে শিল্পীদের সরকারিভাবে একটা তালিকা তৈরি করে মাসিক ভাতার অনুরোধ জানান তারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, নওগাঁ সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ দিকে শৈলগাছী ইউনিয়নের রামরায়পুর গ্রাম। বাঁশের বেড়ায় মাটির প্রলেপ দিয়ে দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘর। এছাড়াও আছে টিন দিয়ে তৈরি ঘর। প্রতিটি বাড়িতে ৩-৪টি করে পরিবার বসবাস করেন। সবাই অর্ধশিক্ষিত।
দূর থেকে শোনা যাচ্ছে `মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি.......` গান। বাড়ির ভেতর গিয়ে দেখা যায় উঠানে বসে লালন চর্চা করছেন তারা। মুগ্ধ হয়ে কয়েকটি গানও শোনা হলো। কথায় কথায় উঠে এলো তাদের জীবন যাপনের চিত্র।
হারমোনিয়াম বাদক আব্দুস সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। রাস্তার ধার ঘেষে টিনের বাড়ি। নিজের বাড়িটুকু ছাড়া আমার আর কোনো সম্পত্তি নেই। ২৫ বছর ধরে লালন সঙ্গীত চর্চা করছি। আর এ সঙ্গীতকে আকড়ে ধরে বহু কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছি আমরা সবাই।
সাত্তারের স্ত্রী রোজিনা বিবি বলেন, তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পাই না। কষ্ট করে দিন কেটে যায় আমাদের। গত চৈত্র-বৈশাখের ঝড়ে টিনের ঘর ভেঙে গেল। তারপর ধার দেনা করে ঘরটি ঠিক করা হলো।
জুরি বাদক আতাউর রহমান হাবলু বলেন, বছরে দু-তিন মাস গান হয়। লালনকে বুকে ধারণ করে ২৭ বছর যাবৎ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গান করি। গান করে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে। গান ছাড়া অন্য কোনো পেশায় কাজ করতে পারি না। স্ত্রী শেফালী কয়েক বছর থেকে ব্যাগ তৈরি করে সংসারে কিছুটা সহযোগিতা করছে।
ঢোল বাদক রবি দেওয়ান বলেন, বাবা-মা`র কাছে ছোটবেলা থেকে গান শিখেছি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শিখতে পারিনি। যদি আমাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং নওগাঁ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে গান শেখানো হতো তাহলে আরো ভালো করতে পারতাম।
শৈলগাছী ইউনিয়নের রামরায়পুর গ্রামে আবু বক্কর সিদ্দিক, কবরি বেগমসহ প্রায় শতাধিক লালন শিল্পী `রহিম চাঁদ দেওয়ান সংঘ` নামে একটি ক্লাব গঠন করে বিভিন্ন এলাকায় লালন সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাদের দাবি সরকারিভাবে যেসব অনুষ্ঠান হয় সেখানে যেন লালন সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়। তাহলে সেখান থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে সংসার চালানো কিছুটা সহজ হবে আমাদের জন্য। ছেলে-মেয়েরা হয়তো আর এ সঙ্গীতকে গ্রহণ করবে না। অন্য কোনো পেশাকে বেছে নেবে।
এছাড়া অবহেলিত এই লালন সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে লালন শিল্পীদের সরকার থেকে মাসিক ভাতার অনুরোধ জানান তিনি। 
নওগাঁ জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক কায়েশ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, একাডেমিতে সঙ্গীত, সাধারণ সঙ্গীত, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, সাধারণ নৃত্য, উচ্চাঙ্গ নৃত্য, চিত্রাঙ্কন, তালযন্ত্র, বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। সঙ্গীতের ২টি শাখা- একটি সাধারণ শাখা এবং অপরটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। সাধারণ শাখার মধ্যে নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আধুনিক গান শেখানো হয়ে থাকে। নওগাঁতে যারা বিচ্ছিন্নভাবে লালন সঙ্গীত চর্চা করেন তারা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে বলে জানান তিনি। এখানে যেসব শিক্ষার্থী আছেন তাদেরকে সঙ্গীতের প্রায় সব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।
এমজেড/এমএস