ছাত্রলীগে ছাত্র নেই, বিবাহিত আর শিবির নেতায় চলছে নেতৃত্ব
সাতক্ষীরার ছাত্রলীগে ছাত্র নেই। চলছে অছাত্রদের রাজত্ব। সেই সঙ্গে এক সময়ের শিবির নেতাও হয়েছেন বর্তমানে ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা। জেলার কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শেখ শাওন আহম্মেদ সোহাগ। এই সোহাগ ছিলেন শিবিরের অন্যতম ক্যাডার।
কখনও বিদ্যালয়ের বারান্দায় যাননি কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল বাসার। পাশাপাশি বর্তমান সভাপতি গৌতম লস্কর বিয়ে করেছেন অনেক আগেই।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিবাহিতদের দিয়ে চলছে সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলার ছাত্রলীগের সকল ইউনিটের কার্যক্রম। এতে একদিকে যেমন ত্যাগী পরীক্ষিত ছাত্র নেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন অন্যদিকে, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না।
চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, অছাত্র ও বিবাহিতদের দিয়ে চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি। এছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বর্তমান ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দরা।
এছাড়া রয়েছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে টাকার বিনিময়ে শিবির নেতাকে ছাত্রলীগের সহ সভাপতি পদ দেয়া হয়েছে। এতে করে চরম হতাশা ও অসন্তোষ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বরে এস.এম. মারুফ তানভীর হুসাইন সুজনকে সভাপতি ও এহসান হাবীব অয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ৯ সদস্যের একটি আংশিক কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি।
এক বছর পরে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট এক বছরের মেয়াদী পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। এক বছরের জন্য অনুমোদন দেয়া হয় এই কমিটি। অথচ এই কমিটি বর্তমানে সাড়ে চার বছরের অধিক সময় পার করেছে ইতোমধ্যে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রলীগ নেতা জাগো নিউজকে বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হুসাইন সুজন বিয়ে করেছেন এক বছরেরও বেশি সময় আগে।
জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আব্দুল মান্নানের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তার একটি মেয়ে রয়েছে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির ভোমরা স্থলবন্দরে মেসার্স জেবা এন্টারপ্রাইজ নামের ভোমরা কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ’র এজেন্ট ব্যবসা রয়েছে। যেটা নিয়ে তিনি সব সময় ব্যস্ত সময় পার করেন। এছাড়া পরিবার-পরিজন নিয়ে দলীয় কার্মকাণ্ডে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না তিনি।
তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সরদার মশিয়ার রহমানের ৫ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। ছাত্রত্ব নেই তবুও বহাল তবিয়তে উপজেলা ছাত্রলীগের পদ আকড়ে ধরে আছেন। কমিটির অধিকাংশ নেতাই বিবাহিত ও অছাত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রলীগ নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমান কমিটির বিবাহিত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হুসাইন সুজন, সহ-সভাপতি নাছিম হায়দার রিপন, সহ-সভাপতি জাহিদ হাসান, সাইফুল আযম জিমি, মারুফ হাসান রিঙ্কু, খন্দকার আরঙ্গজেব নয়ন, সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের রাজু, তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সরদার মশিয়ার, আশাশুনি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির সমুন, দেবহাটা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান সবুজ, সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি গৌতম লস্কর, সাধারণ সম্পাদক আবু নাজিরসহ আরও বেশ কয়েকজন বর্তমানে বিবাহিত।
এছাড়া জেলা কমিটিসহ ৭টি উপজেলার মধ্যে ৪ উপজেলার সভাপতি বিবাহিত। এদের বেশিরভাগ নেতার বয়স ২৯ এর ঊর্ধ্বে এবং তারা সন্তানের জনক ও ব্যবসায়ী। এছাড়া ইউনিয়ন কমিটিগুলোর একই অবস্থা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের রাজু ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা অসাদুপায় অবলম্বন করার দায়ে দুই বছর বহিষ্কার করা হয়। তিনিও বিবাহিত।
বিয়ের কথা স্বীকার করে তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সরদার মশিয়ার বলেন, আমি কমিটিতে আছি। বিয়ে করেছি কিছুদিন আগে। এতে কোনো সমস্যা নেই।
এদিকে, দেবহাটা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বিয়ের বিষয় স্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।
এছাড়া কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি গৌতম লস্করও বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনিও।
এসব বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এহসান হাবীব অয়নের কাছে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আপনি একটু পরে ফোন দেন। পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হুসাইন সুজন জাগো নিউজকে বলেন, আপনি সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে কথা হবে বলে ফোন কেটে দেন।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, যেসব ইউনিটের সভাপতি বা সম্পাদকরা বিবাহিত রয়েছেন তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সাতক্ষীরার বিষয়গুলো আমি অবগত রয়েছি।
তিনি বলেন, সত্য সংবাদ প্রকাশ করায় যদি কোনো সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা হয় তবে সেই ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাংবাদিকের ওপর আঘাত করলে সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি অবগত করার কথা জানান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
আকরামুল ইসলাম/এএম/আরআইপি