ইংকা গজব যেন আল্লাহ শক্রকো না দেয় : বাঁধ ভাঙা মানুষের আর্তি
সারিয়াকান্দির কামালপুর ইউনিয়নের ইছামারা গ্রামের বাসিন্দা হালিমা বেওয়া। বয়সের ভারে ঠিকমতো চলতেই পারেন না। তারপরেও বিধাতা যেন অবুঝ। মাত্র ১০ মাস আগে পাশ্ববর্তী চন্দনবাইশা গ্রাম থেকে ঘর-বাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন কামালপুরে। এখন সেখানেও একই অবস্থা। নদী ভাঙন এই বৃদ্ধ বয়সে তাকে যেন তাড়া করে ফিরছে। জানালেন, বাবা এই বিরিদ্দ বয়সোত লিজেই চরবার পারিনা। একুন আবার বানের ভয়ে পাল্লা-হাড়ি লিয়া ছুটে বেড়াচ্ছি। ইংকা গজব যেন আল্লাহ শক্রকো না দেয়।
পাশের বাঁধের উপর অবস্থান নিয়েছেন একই গ্রামের মুদি দোকানি আকরাম মন্ডল। জানালেন, প্রতিবছর এক খান্তি থেকে অন্য খান্তি ছুটে বেড়ানাই একুন হামাকেরে নসিব হয়ে গেছে। স্যাররা (পাউবো কর্মকর্তা) এনা আমাকেরে কষ্ট বুজলে ইংকা বানের আগে কাম ধরলোনিনা। শুকনা মৌসুমোত কাম হলে হামকেরে এতো ক্ষতি হলোনানি।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারিয়াকান্দিতে ভেঙে যাওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি এখনো মেরামত শুরু করা হয়নি। নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা হচ্ছে প্লাবিত। ১০ মাস আগে উপজেলার চন্দনবাইশা দড়িপাড়ায় ভেঙে গিয়েছিলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। আর এবার চন্দনবাইশার অদূরে কামালপুরে নতুন করে নির্মাণের মাঝপথেই ভেঙেছে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের মাঝের অংশটি।
স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে জানান, এভাবে বাঁধ ভাঙার ঘটনা যেন নিয়মিত হয়ে গেছে নদী তীরবর্তী এলাকাতে। বাঁধ ভাঙার কারণে সৃষ্ট বন্যায় যমুনা তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ছে উদ্বাস্তু। এর কারণও একটাই, বর্ষা এলেই বাঁধ মেরামতের তোড়জোড় চলে। শুকনো মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকে। তাই কমছে বাঁধগুলোর স্থায়ীত্ব।
গতকাল শনিবার বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি বিপদ সীমার ৯ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভাঙা বাঁধের কারণে উজান থেকে আসা বন্যার পানি সারিয়াকান্দির কামালপুরের বাঁধের ভিতর দিয়ে প্রবল বেগে প্রবেশ করায় উপজেলার ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে ইছামারা, কামালপুর, সুতানারী, হাওরাখালি, গোদাখালি, বোরোইল, দড়িপাড়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। গতকাল নতুন করে এবং পাশ্ববর্তী ধুনট উপজেলার ৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এই সব গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত গ্রামগুলোর মানুষ বাড়ির জিনিসপত্র, গৃহপালিত পশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, নির্মাণাধীন বাঁধ ভাঙার ফলে উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় দূর্গত মানুষের জন্য এখনো কোনো সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তবে, বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
জানা গেছে বাঁধ ভাঙা পানিতে কামালপুর ইউনিয়নের এক হাজার ২০০ বাড়ি-ঘর, ৭০ হেষ্টর জমির পাট, ১০ হেষ্টর জমির আউশ ধান, বীজতলা ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। ১০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ২টি হাইস্কুল ও ১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যা কবলিত হবার কারণে পাঠদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
কামালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোখলেছার রহমান বলেন, গোদাখালী এলাকায় নির্মাণাধীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিভিন্ন গ্রামে পানি ঢুকেছে। এতে ওইসব গ্রামের কাঁচা রাস্তাগুলো তলিয়ে গেছে। ফলে জনগণের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন জানান, পানি কমে গেলে বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশ মেরামত করা হবে। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাত পর্যন্ত সারিয়াকান্দি উপজেলার গোদাখালীতে নির্মাণাধীন বাঁধের ৫০ মিটার ধসে যায়। এরপর তা বেড়ে রোববার বেলা ১১টা পর্যন্ত আরও প্রায় ৬০ মিটারে গিয়ে দাঁড়ায়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের ২৮ আগস্ট যে বাঁধটি ভেঙেছিল সেটির দৈর্ঘ্য ছিল পৌনে ৪ কিলোমিটার। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর দুই মাসও টেকেনি সেই বাঁধ।
এমএএস/আরআই