নরমাল ডেলিভারিতে দিন পাল্টেছে বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের
ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। গর্ভবর্তী মায়েদের নরমাল ডেলিভারি করে সেরকমই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসরা। বদলে দিয়েছেন উপজেলার চিকিৎসা সেবার চিত্র।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসক মিলে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। তাদের এই উদ্যোগ নজির সৃষ্টি করেছে।
ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালুর মাধ্যমে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে শিশুবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসবের উদ্যোগ সফলতা লাভ করায় এটি দিনাজপুর জেলায় মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
চিকিৎসকদের এই মহতি উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়ে সফলতা কামনা করে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় (চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ) সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইতোমধ্যে বার্তা প্রদান করেছেন।
উপজেলায় অলিগলিতে বেসরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিক হওয়ায় দালাল চক্রের কারণে নরমাল ডেলিভারি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এসব ক্লিনিক এবং হাসপাতালে সেবার পরিবর্তে শুরু হয়েছে প্রসূতি সিজারের নামে এক ধরনের ব্যবসা। আর অর্থের লোভে তাদের হয়ে কাজ করছে একটি দালাল চক্র।

আবার গ্রামাঞ্চলে কিছু অদক্ষ, প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রী রয়েছেন যারা স্থানীয় ভাবে দাই মা বলে পরিচিত। এই দায় মার কারণে প্রসূতি মায়েদের মৃত্যু ঝুঁকি থাকে এমনকি মৃত্যুও ঘটে। এমন অনেক ঘটনার নজির রয়েছে এলাকায়। ক্লিনিকেও প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে সিজারের নামে বাণিজ্য, দালাল চক্র এবং অদক্ষ ধাত্রীর হাত থেকে প্রসূতি মায়েদের রক্ষায় এবং নিরাপদে নরমাল ডেলিভারি করাতেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীরের নেতৃত্বে বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন চিকিৎসক টিম ওয়ার্ক শুরু করেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করেন বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকগণ। নরমাল ডেরিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করতে প্রসূতিদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণায় তারা বিভিন্ন কৌশলও কাজে লাগিয়েছেন। এজন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে প্রসূতি নারীদের বিনামূল্যে ‘প্রসূতি কার্ড’ দেয়া হয়। এরপর ডেলিভারি না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে কাউন্সেলিং আর ফ্রি চেকআপ।
প্রসূতি কার্ড ও নরমাল ডেলিভারি করাতে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষক, চেয়ারম্যান-মেম্বার, ইমাম ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন এনজিওর স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো হয় প্রসূতি মায়েদের কাছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরাও নিজেরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাউন্সিলিং প্রদান করেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এ টিম ওয়ার্কে রয়েছেন বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান পলাশ, মেডিকেল অফিসার ডা. আফরোজ সুলতানা, ডা. তাহমিনা ফেরদৌস, ডা. মাধবী দাস।
প্রথম দিকে খুব একটা সাড়া না পেলেও এই টিম ওয়ার্কের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের গত আগস্ট মাসে ৩৫ জনের নরমাল ডেলিভারি করানো হয়। আর এ সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত ২৫টি নরমাল ডেলিভারি করানো হয়েছে। হাসপাতালে এসে নরমাল ডেলিভারি করানোর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।

বীরগঞ্জের দামাইক্ষেত্র গ্রামের মো. আজিজার রহমানের স্ত্রী মোছা. জেসমিন আকতার (৩৩)। তার ৩ সন্তান। শুক্রবার সকালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন এই প্রসূতি।
অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে মোছা. জেসমিন আকতার জানান, দেরি করে সন্তান নেয়ায় ও এলাকার কিছু লোকের কথায় ভয় পেয়েছিলাম। অনেকে ক্লিনিকে সিজার করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠকর্মী এবং চিকিৎসকরা অভয় দিয়ে দায়িত্ব নিলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হই। এখানে নরমাল ডেলিভারিতে আমার সন্তান জন্মলাভ করেছে। আমি এবং ছেলে এখন সুস্থ্য আছি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান পলাশ জানান, এক সময় বীরগঞ্জ হাসপাতালে প্রসূতিরা না আসায় নরমাল ডেলিভারি করানো প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে আমরা সবাই মিলে টিম ওয়ার্ক শুরু করি। দালাল চক্রের কিংবা দাইমাদের (ধাত্রী) বাধা উপেক্ষা করে এর সফলতা পেয়েছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর জানান, এ হাসপাতালে ডেলিভারি নিরাপদ করতে ৫ জন দক্ষ ধাত্রী রয়েছেন। ডেলিভারি হওয়ার পর উপজেলা সমাজ সেবা অধিফিতরের সহযোগিতায় জন্ম নেয়া শিশুর জন্য জামা-কাপড়, মশারি ও ওই শিশুর মাকে উপহার দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দিন দিন নরমাল ডেলিভারিতে প্রসূতিদের আগ্রহ বাড়ছে। কারণ হাসপাতালে নিরাপদে এ ডেলিভারি করানো হলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে না। পাশাপাশি কোনো প্রকার খরচ করতে হয় না রোগীর স্বজনদের।
এমদাদুল হক মিলন/এফএ/জেআইএম