থেকেও যাদের কেউ নেই তারা যাচ্ছেন সাবিত্রীকুঞ্জে
কলকাতার জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী নচিকেতার সেই বৃদ্ধাশ্রম গানের কথা `ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার....আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম! স্মরণ করিয়ে দেয় একটি সন্তান শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যখন সংসার জীবনে পদার্পণ করে। তাদের ঔরষে জন্ম নেয়া সন্তানের কাছে বাবা-মা যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তখন তাদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে!
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার গ্রামীণজনপদের রাধানগর গ্রামে এক শিক্ষক নিজ উদ্যোগে মাস কয়েক আগে গড়ে তোলেন সাবিত্রীকুঞ্জ সেবাশ্রম নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে কথা হয় সদ্য গড়ে ওঠা ওই সেবাশ্রমে থাকা উপজেলার চৌহরিয়া গ্রামের মৃত সুরেন্দ্র মণ্ডলের স্ত্রী ৯২ বছর বয়সী সোনা লক্ষ্মী মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান স্বামী, সন্তান বা স্বজন বলতে তার এখন কেউ নেই। বয়স বেড়েছে। ৩ মাস আগে তিনি এখানে এসেছেন। আর ৩ বেলা পেট পুরে খেয়ে সামনে হরি মন্দিরে পূজা অর্চনার মধ্য দিয়ে অন্যদের সঙ্গে বেশ ভালোই আছেন তিনি। তবে অন্তিম সময়ে কী আছে ভাগ্যে এ নিয়ে তার উৎকণ্ঠার শেষ নেই।
ওই আশ্রমে থাকেন কাঠালীয়া উপজেলার উত্তর চেচরী গ্রামের শোভা রানী (৭০)। তার পরিবারের সবাই ভারতে। আরেক বাসিন্দা মন্টু রানী (৫৫)। স্বামী সন্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।
ইন্দুরকানী উপজেলার কালাইয়া গ্রামের কেশব লাল সরকার (৯১)। ২ বছর আগে তার স্ত্রী মারা যান। তার কিছুদিন পর জ্বরে ২ সন্তানও মারা যায়। সন্তানের চিকিৎসা করাতে তাকে হারাতে হয় সবকিছু। অবশেষে ঠাঁই মেলে সদ্য গড়ে ওঠা এ সেবাশ্রমে।
কথা হয় ওই এলাকার কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে। তারা জানান, এ উদ্যোগটি খুবই ভালো। তবে এটির পরিধি আরো বাড়বে বলে আশা করছি আমরা। এখানে চিকিৎসা সেবা পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেক দূর যেতে হয়। এখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রায় ৭ কিলোমটির দূরে। আর সেখানে যেতে মূল সড়কে উঠতে ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
দেখা মেলে আশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা ঢাকার বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক ফনি ভূষণ মিত্রের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ৩১ বছর ধরে শিক্ষকতা করার সুবাদে আমি অনেক দরিদ্র, অনাথদের ফ্রি টিউশনি, কখনো নিজের টাকায় গরীবদের ফরম ফিলাপ এর ব্যাপারে সাহায্য করেছি। আর মাত্র ৫ বছর চাকরি আছে। নিজের ২টি ছেলের মধ্যে বড় ছেলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যজন প্যারামেডিকেলে পড়ছে। তাই জীবনের শেষ বয়সে মানবতার সেবায় কাজ করার জন্য তিনি এ উদ্যোগটি গ্রহণ করেন ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এরপর একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর সরকারি অনুমতি পাওয়া যায়। যার সরকারি রেজিনং-৯৪৪/১৪।
এটি করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন সেটি কিভাবে যোগান দেয়া সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমার বড় ভাই সাধু (হরি চাদের মতে) এবং পরিবারের আরো ১১ বিঘা জমি রয়েছে। তাছাড়া অতিরিক্ত ৯ বিঘা জমি ক্রয় করে মোট ২০ বিঘা জমির উপর এ আশ্রমটি গড়বো। এলাকার যুবকদের দক্ষ শ্রমজীবি হিসেবে তৈরি করতে একটি টেকনিক্যাল ও একটি প্যরামেডিক্যাল হাসপাতাল করার ইচ্ছা আছে।
অর্থের যোগানের বিষয়ে তিনি বলেন, রিটায়ার্ডের পর ৩০ লাখের মতো টাকা ছাড়াও অন্য আরেক ভাই এবং আমার অনেক ছাত্র এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়াও যদি বিবেকবান ধনাঢ্যরা এগিয়ে আসেন তাহলে হয়তো এ উদ্যোগটি সফল করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।
এসময় আশ্রম সংলগ্ন একটি টিনশেড ঘরে শিশু ওয়ান থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ২০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হচ্ছে।
এমজেড/এমএস