মা মারা যাওয়ার দিনও অভিনয় করেছিলেন অলিম উদ্দিন
এক সময় গ্রামের মানুষের বিনোদনের জন্য আয়োজন করা হতো ‘যাত্রাপালা’। মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে চলত ভোররাত পর্যন্ত। যাত্রাপালা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন এর সঙ্গে সম্পৃক্তরা। সময়ের পরিক্রমায় আজ তারা পেশা বদলেছেন। হাতে হাতে স্মার্ট ফোন ও বাড়িতে টেলিভিশনে ক্যাবল নেটওয়ার্ক সংযোগ থাকায় রিমোর্ট টিপলেই চ্যানেল পাল্টে নতুন কিছু। ফলে আগ্রহ কমেছে যাত্রার দিকে।
তেমনই একজন যাত্রা অভিনেতা নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কাষ্টগাড়ী গ্রামের অলিম উদ্দিন। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। বয়স হওয়ায় গত ২০ বছর আগে যাত্রা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন বাড়ির গরু-ছাগল লালন পালন করে সময় পার করছেন।
মিষ্টভাষী এ মানুষটির মুখে সব সময় যেন হাসি লেগেই আছে। দুঃখ যেন তাকে স্পর্শ করে না। মানুষকে হাসিখুশি রাখাই যেন তার কাজ। স্বল্প সময়ে যাত্রার অভিনয় ও কৌতুক বলে মন খারাপ থাকা মানুষের মন জয় করতে পারেন। এলাকায় বড়দের কাছে চাচা আর শিশুদের কাছে দাদু নামে পরিচিত।
বাড়ির পাশে নহেলা কাস্টগাড়ি আবাসন প্রকল্পে গরু-ছাগল চরিয়ে (ঘাস খাইয়ে) সময় পার করেন। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে সেখানে একটি বাঁশের মাচা ও খড়ের চালার খুপড়ির মধ্যে বসে থাকেন। আবাসন প্রকল্পের শিশুদের গান ও অভিনয় শুনিয়ে তাদের আনন্দ দেন।
তিনি সাধারণত দুইটি অভিনয় করে দেখান ‘হায় ভগবান আমার অদৃষ্টে কী এই ছিল। এই খড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে আজ আমি পথে পথে ঘুরছি। উফ ভগবান, আর আমার প্রাণে সহ্য হচ্ছে না’। ‘একি, কটূবাক্য হানু সন্তানের প্রতি, নেমে এসো, নেমো এসো আকাশ হইতে--’

শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য গান গেয়েও শোনান, ‘ওকি প্রাণ কোকিলারে, এতো রাতে কেন ডাক দিলে, প্রাণ বন্ধু, সাদা দিলে কেন দাগা দিলে’।
সাবেক এ যাত্রা অভিনেতা অলিম উদ্দিন বলেন, এক সময় গ্রামে গ্রামে খুব যাত্রা হতো। তখন চাহিদাও ছিল। বসে থাকার কোনো সময় ছিল না। এমনকি মা যেদিন মারা যায় সেদিও যাত্রা করতে হয়েছে। এখন সেই বইগুলো আর পাওয়া যায় না। ‘সাগর ভাষা, ভাগ্যচক্র, পোষ্যমালা’ নামে তিনটি যাত্রার দল ছিল। এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ জন।
রংপুর, বগুড়া, চাপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় যাত্রা করতেন দলবল সহ। ১৫ বছর যাত্রা করেছেন। অবসর নিয়েছে প্রায় ২০ বছর আগে। এখন যাত্রার অন্য সদস্যরা জীবন জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। মোবাইলের যুগে সব হারিয়ে গেছে। আমার বয়সি অনেকেই মারা গেছে।
স্থানীয় মজিবর রহমান বলেন, বড় ভাইয়ের মনে সব সময় রং লেগেই থাকে। হাসিখুশি এ মানুষটি সবাইকেই আনন্দ দেন। এক সময় যাত্রাপালা করলেও এখন সব বন্ধ। যাত্রা পালার চাহিদা না থাকায় সদস্যরা কেউ কৃষি কাজ, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান।
আব্বাস আলী/এফএ/এমএস