সীমান্তে বেড়েছে তৈরি পোশাকের চোরাচালান
ঈদকে সামনে রেখে যশোরের সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে তৈরি পোশাকের চোরাচালান বেড়ে গেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পোশাক আসছে চোরাচালান হয়ে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা।
গত ৩ মাসের ব্যবধানে যশোর বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার পোশাকের চালান আটক করেছে। অবৈধভাবে পোশাক আসার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চোরাচালানিরা বৈধভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব পণ্য দেশের বাজারে নিয়ে আসছে।
এছাড়া প্রতিদিনই ল্যাগেজ ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত কিছু পাসপোর্টধারী যাত্রীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ শাড়ি, থ্রিপিস, গেঞ্জি, কাপড় আটক করা হচ্ছে। এগুলো পাসপোর্টধারী যাত্রীদের নাম উল্লেখ করে বেনাপোল কাস্টমসে জমা দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে শুল্ক পরিশোধ করে মালামাল খালাস করে নিয়ে যাচ্ছে যাত্রীরা।
জানা গেছে, যশোরের ডিবি পুলিশ গত ১১ জুন যশোর-বেনাপোল সড়ক থেকে ট্রাক ভর্তি ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস এবং থান কাপড়সহ দু’জনকে আটক করে। উদ্ধারকৃত কাপড়ের মূল্য ছিল ৬০ লাখ টাকা।
যশোর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, যশোর-বেনাপোল সড়কের উল্লাশি নামক স্থানে ট্রাক তল্লাশি করে এক হাজার ৮১৬টি শাড়ি ও থ্রিপিস এবং ২ হাজার মিটার থান কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দকৃত মালামালের মূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে তিনি জানান। এসময় পুলিশ চালক সোহেল এবং হেলপার সোহাগকে আটক করে।
এর আগে ৪ জুন বিজিবির ২৬ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের আমদানি করা ঘোষণা বর্হিভূত ভারতীয় পোশাক আটক করে। আটককৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে থান কাপড়, থ্রিপিছ, জুতা-স্যান্ডেল, বেবী ফুড এবং ইমিটেশন সামগ্রী। যশোর-বেনাপোল সড়কের আমড়াখালি ব্রিজের কাছ থেকে কাভার্ড ভ্যান ( ঢাকা মেট্রো-ট-১৬-৯৭৪৪) ভর্তি ওই পণ্য আটক করা হয়।
যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন হচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোলের আমড়াখালী চেকপোস্ট থেকে দু’টি পণ্য বোঝাই কাভার্ড ভ্যান আটক করা হয়। পরে গাড়ি তল্লাশি করে কাগজপত্র দেখে একটিতে বৈধ চা-পাতা পাওয়া যায় যা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অপরটিতে ঘোষণার বাইরে অতিরিক্ত পণ্য থাকায় তা আটক করে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে জমা দেওয়া হয়েছে। আটককৃত পণ্যের মূল্য ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ইন্সপেক্টর (গোডাউন ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ) মাহমুদ হোসেন বলেছেন, অবৈধ ঘোষণা দিয়ে পণ্য পরিবহনের অভিযোগে বিজিবি সদস্যরা ৪ জুন ভারতীয় একটি পণ্যের চালান আটক করে কাস্টমস গোডাউনে জমা দিয়েছেন। এ সকল পণ্যের মধ্যে থ্রিপিচ, থান কাপড়, জুতা, স্যান্ডেল, বেবী ফুড ও লেস রয়েছে। এরকম গত ৩ মাসে অন্তত শত কোটি টাকার পণ্য আটক করেছে যশোর বিজিবি সদস্যরা।
বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের একটি দল ১৬ জুন রাতে প্রায় পৌণে ২ কোটি টাকার ভারতীয় বিভিন্ন প্রকার কাপড় উদ্ধার করে। মণিরামপুরের মশিহাটি বাজারের কাছে একটি আম বাগান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ওই কাপড় উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৯৩ পিস শাড়ি, ৬৫টি থ্রিপিস এবং ৫৯ বান্ডিল থান কাপড় জব্দ করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শার্শা উপজেলার গোগা, অগ্রভুলোট, পুটখালি, দৌলতপুর, বড়আঁচড়া, বেনাপোল, সাদিপুর, রঘুনাথপুর, ঘিবা, ধান্যখোলা, শিকারপুর, নারকেলবাড়িয়া, শালকোণা, শিববাস, টেংরালি, কাশিপুর এবং চৌগাছার কাবিলপুর, শাহাজাদপুর, মাশিলা, বর্ণি, হিজলি, বল্লবপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পোশাক আসছে। অভিযোগ রয়েছে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের সাথে সখ্যতা গড়ে বৈধমালের সাথে অবৈধ পণ্য নিয়ে আসা হচ্ছে।
যশোর তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন কালেক্টরেট মসজিদ মার্কেটের সভাপতি নেসার আহমেদ মুন্না জানান, অবৈধভাবে পোশাক আসার কারণে আমাদের ব্যবসায় দারুণ প্রভাব পড়ছে। সেই সাথে দেশীয় পোশাকের ব্যবসা মার খাচ্ছে। কেননা ভারতীয় পোশাক চোরাচালান হয়ে আসলে তার দাম অনেক কম রাখা হয়। এতে প্রতিযোগিতায় দেশীয় পোশাক বা আমদানি করা পোশাক ব্যবসায়ীরা লোকসানের শিকার হন।
যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, প্রতিদিন চোরাচালান বিরোধী অভিযান চলে। তারপরও ঈদকে সামনে রেখে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার সিরাজুল ইসলাম জানান, অবৈধভাবে শুধু পোশাক নয়, যে কোনো পণ্য আসলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানির উপর। এতে আমদানি কমে আসে। আর আমদানি কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব দেখা দেয়।
মো. জামাল হোসেন/এসএস/আরআই