ঈদে মুখ থুবড়ে পড়েছে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লী
সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ২০০৪ সালে ১২ ডিসেম্বর ৯০টি প্লট বিশিষ্ট ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর উদ্বোধন করা হলেও সেখানে বর্তমানে ৮টি প্লটে কারখানা চালু রয়েছে। বাকিগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি শুধুমাত্র ভারতীয় শাড়ি আমদানির কারণে। দক্ষ কারিগর, ভালো পরিবেশ ও কারখানা মালিকদের ব্যবসায়িক মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও তারা কারখানাগুলোতে উৎপাদন ঠিক রাখতে পারছেন না। যদিও ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর উৎপাদিত শাড়ি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা শাড়ি উৎপাদন করে ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছেন না।
মূলত, দুই ঈদের জন্য বেনারসি পল্লীর তাঁতিরা অপেক্ষা করেন সারা বছর ধরে। এখন রমজান মাস চলছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতোই ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর ব্যবসায়ীরাও আশায় বুক বেঁধেছিলেন। গোটা রমজান মাসে ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শাড়ি উৎপাদন ও বিক্রি করে বেশি টাকা আয় করবেন তাঁতীরা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
দেশের অবস্থা, পরিবেশ পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকার পরও এবার বেনারসি ব্যবসায়ীরা হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। নানাবিধ কারণেই বেনারসি ব্যবসায়ীদের হতাশার মধ্যে পড়তে হয়েছে। প্রথমত, ভারতীয় বেনারসি ও কারচুপিসহ বিভিন্ন প্রকার দামি শাড়ি অবাধে আমদানির কারণে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লী অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় বছরের পর বছর অনেক কারখানা মালিকই তাদের উৎপাদিত বেনারসি শাড়ির পাশাপাশি ভারতীয় থান কাপড় এনে তাতে কারচুপির কাজ করে লেহেঙ্গা, শেরওয়ানি, থ্রিডি শাড়ি, চুলবুলি শাড়ি, থ্রিপিস, পার্টি শাড়ি, বিয়ে শাড়িসহ বিভিন্ন প্রকার কাপড় ও থ্রিপিসে কাজ করে কোনো রকমে টিকে আছে।
সেই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান ও চীন থেকে আমদানিকৃত জর্জেট ও নেট কাতানের ওপর পুঁথি, চুমকি, মুক্তা জরি, কালার স্প্রে, হাসকাল ডুগাল, তাইওয়ান গুল্লা ও নাকা পাথর দিয়ে হাতের কাজ করা খুব সুন্দর সুন্দর চমৎকার চোখ ধাঁধানো আকর্ষণ করা বিয়ের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। এই এলাকার হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ এ তাঁতি পেশার উপর নির্ভরশীল।
অনেক কারিগর অন্য পেশা ছেড়ে ইতোমধ্যে এই শাড়ি তৈরির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। শুধু তাই নয় স্কুল, কলেজের ছাত্র/ছাত্রীরাও এই পেশায় জড়িত আছে। একটি তাঁত শ্রমিকের দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করে একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে কারিগর ভেদে ২/৩দিন। এভাবে শাড়ি ভেদে মজুরি ১১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০ টাকা, এমনকি ২৫০০ টাকা পর্যন্তও মজুরি হয়ে থাকে।
ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীতে ঈদ উপলক্ষে ফুলকলি, আনার কলি, পিত্তর কাতান, নেট কাতান, জর্জেট কাতান, বাহারি কাতান, জামদানি কাতান, চারকাড়ি হাসকাল ডুগলি ও টিস্যু কাতান ইত্যাদি ছাড়াও প্রভৃতি নামের বহু ডিজাইনের রমরমা বাহারি শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে।
বেনারসি কারিগররা জানান, এবার ঈদ উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ ধরনের শাড়ি ঈদের আগের মূহুর্তে তোলা হবে। সে শাড়ির নাম এখনো নির্ধারণ হয়নি। ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর মদিনা টেক্সটাইল, জার্মানি টেক্সটাইল তাঁত শ্রমিক নাদিম, হাশিম, রাজু, চাঁদ মিয়া, রাঙ্গিলা, সুমন, নাসিম হোসেন জানান, এখানকার তৈরি বেনারসি শাড়ি দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে শাড়ি ভেদে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয়ে থাকে।
ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর মালিক জাবেদ জাগো নিউজকে বলেন, শ্রমিকদের অভিযোগ বেনারসি পল্লীতে ক্যালেন্ডার মেশিন না থাকায় ঢাকার মিরপুরে গিয়ে ক্যালেন্ডার পালিশ করতে প্রতি পিস শাড়িতে অতিরিক্ত ১৫০ টাকা থেকে শাড়ি ভেদে ৪০০ টাকা খরচ গুণতে হয় তাদের।
এদিকে বেনারসি শিল্পের ওপর নির্ভর করে ফতেমোহাম্মদপুর কয়েকটি শাড়ির দোকান ও শো-রুম গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে লোকো রোডে অবস্থিত আসিফ, কারুকা শিল্প, বাদল বেনারসি হাউজ, জাবেদ ব্রাদার্স শাড়ি হাউজ, আধুনিক কারচুপি হাউস, চাঁদ শাড়ির ঘর, লাড্ডান বেনারসি হাউস ইত্যাদিসহ অনেক ছোট বড় শাড়ির শো-রুম দোকান ও কারখানা।
ভাই ভাই কারচুপি হাউজ ও আধুনিক কারচুিপ হাউজের স্বত্ত্বাধিকারী আফজাল হোসেন আরশাদ জাগো নিউজকে জানান, ভারতীয় নামিদামি ব্রান্ডের শাড়ি আমদানি হলেও মানের দিক থেকে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীতে উৎপাদিত শাড়ির মান অনেক উন্নত। ক্রেতারা নামে বিশ্বাস করে ভারতীর শাড়ি কিনে থাকেন। একটু বেশি দাম হলেও মানের দিক দিয়ে ঈশ্বরদীতে তৈরি বেনারসি শাড়ির মান ভালো ও টেকসই। ঈদ সমাগত হলেও বেনারশির চাহিদা কম হওয়ায় আমরা বাধ্য হয়েই ভারতীয় থান কাপড়ের উপরে কারচুপির কাজ করে বাজারজাত করছি।
একইভাবে আলমগীর বেনারসি , সোহেল বেনারসি , শামিম বেনারসি , জাবেদ বেনারসি , নাদিম বেনারসি , মহিউদ্দিন বেনারসি , জাবেদ বেনারসি অ্যান্ড সিল্ক হাউজের অবস্থা শোচনীয়। এসব কারখানার মালিকরাও অন্যান্যবারের মতো এবার ঈদ মৌসুমে ভালো ব্যবসা করতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে।
ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কার সিদ্দিক জাগো নিউজকে জানান, ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর উদ্বোধন করা হয় মোট ৯০টি প্লট দিয়ে। উদ্বোধনের পর ৮টি কারখানা চালু করা হয়। প্রতিদিন এসব কারখানায় ৪০ জন করে কারিগর কাজ করেন।
এখানে দৈনিক ২০ থেকে ২৫টি করে উন্নতমানের বেনারসি শাড়ি উৎপাদন করা হয়। শাড়ি তৈরির পর ঢাকার মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে পালিশ করার জন্য পাঠানো হয়। এতে কারখানা মালিকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এদিকে রোজা শুরু হলেও এবার এখনো বেনারসি পল্লী এলাকায় শাড়ি উৎপাদন ও বিক্রিকে ঘিরে কর্মচঞ্চলতা দেখা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ধারণা করছেন ভারতীয় কাতানসহ বিভিন্ন প্রকার শাড়ি আমদানি বন্ধ না করা এবং সরকারিভাবে কারখানা মালিকদের পর্যাপ্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া না হলে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লী এক সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমজেড/এমএস
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ তাহাজ্জুদের পর একটি দল ভোটকেন্দ্র দখল-সীল মারার পরিকল্পনা করছে
- ২ ভোটের দিন কোনো চিল ছোঁ মেরে ভোট নিয়ে যাবে তা হবে না
- ৩ দিল্লিতে অফিস খুলে হাসিনা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছেন
- ৪ মঙ্গলবার ময়মনসিংহ যাচ্ছেন তারেক রহমান, বিপুল সমাগমের আশা
- ৫ আজ মুক্তি মিলছে না সাদ্দামের, জামিনের চিঠি যশোর কারাগারে আসেনি