ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

চোখের পানি পড়েছে ঠিকই তবে সেটা কষ্টের, অবমূল্যায়নের

জেলা প্রতিনিধি | ঠাকুরগাঁও | প্রকাশিত: ০৪:০৮ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৭

বাড়ি থেকে প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হেঁটে ফুটবল খেলতে যাই। প্রায় দুই ঘণ্টা খেলার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয়। প্রতিদিন এভাবে যাওয়া আসা করতে শরীরে শক্তি পেতাম না। তারপরও তাজুল স্যারের অতি আগ্রহ ও সম্মানের দিকে চেয়ে খেলতে যেতাম।

শত অভাব অনটনের মাঝেও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আমরা ফাইনাল খেলতে গেছি ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সেখানে ৭০ মিনিট পুষ্টিহীন শরীর নিয়ে দৌঁড়েছি শক্তিশালী একটি দলের বিপক্ষে। তাদের মতো আমাদেরও উন্নত ব্যবস্থাপনা থাকলে আমরাই চ্যাম্পিয়ন হতাম। রানার্স আপ হয়েও জয়ের ঘ্রাণ বার বার নিয়েছি এই ভেবে যে, উঠে এসেছি কোন স্থান থেকে সেটি চিন্তা করে। যখনই ভেবেছি আমাদের বাড়ি দেশের সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলায়।

যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এখনও মোবাইল কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক যায় আর আসে। সেখান থেকে উঠে এসে রাজধানীর বুকে একটি দল রানার্স আপ হয়েছে সেটাই বা কম কিসের। এই স্বান্তনা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে ট্রেনে উঠেছিলাম আমরা।

ভেবে নিয়েছিলাম ট্রেন থেকে নেমেই দেখব শত শত মানুষ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আমরাও তাদের জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলে হেরে যাওয়ার কষ্টটা হালকা করে নেব। সব ভাবনা যেন স্বপ্ন ছিল আমাদের। ট্রেন থেকে নেমে চোখের পানি পড়েছে ঠিকই। তবে সেটা কষ্টের, অবমূল্যায়নের।

jagonews24

ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের কিশোরী খেলোয়াররা বাড়ি ফিরছে জেনে রোববার সকালেই জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক হাজির হয়েছিল জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার রেলস্টেশনে। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে ঠাকুরগাঁও জেলাকে উচ্চতায় পৌঁছে দেয়া এসব কিশোরীদের। খেলা নিয়ে তাদের অনুভূতি জানতে চাইলে কষ্টের বর্ণনা করতে করতে এভাবেই আবেগ ঘন মুহূর্ত গড়ে তোলে তারা।

স্টেশন থেকে হেঁটে তারা পীরগঞ্জ বাস স্টেশনে যায়। সেখান থেকে একটি লোকাল বাসে করে রাণীশংকৈল উপজেলায় পৌঁছায় তারা। তাদের সঙ্গী বোনে যায় এই প্রতিবেদকও।

প্রথমবারের মত চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণ করে রানার্সআপ ট্রফি অর্জন করার পরেও স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিরা নারী ফুটবলারদের খোঁজ নিতেও আসেনি তখন। বরং অবহেলা, লাঞ্জনা করা হয়েছে তাদের এমনটাই মনে করছেন রাণীশংকৈল উপজেলার রাঙ্গাটুঙ্গীর এই প্রমিলা মেয়েরা।

খেলোয়ারদের উৎসাহ দেয়ার জন্য ক্রীড়া সংস্থা বা প্রসাশনের কেউ স্টেশনে না থাকলেও কয়েকজন পথচারি ফুল দিয়ে বরণ করে নেয় তাদের। পরে ক্ষুদে প্রমিলা ফুটবলাররা ভ্যানযোগে নিজ নিজ বাড়িতে রওনা দেয়।

৫৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের ট্রেন, লোকাল বাস ও ভ্যানযোগে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে আসায় ক্ষুদ্ধ স্থানীয়রা ও অভিভাবকরা। এই অবহেলা আগামীতে নারী ফুটবল খেলায় মেয়েদের আগ্রহ কতটুকু বাড়াবে তা জনমনে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।

প্রমিলা নারী ফুটবলার আশামনি, কল্পনা, মুনিরা, সাগরিকা, শিল্পী, শ্যামলীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রথমবারের মতো আমরা জাতীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত খেলায় অংশগ্রহণ করে খুবই আনন্দিত। কষ্ট করে ট্রেনে ও বাসে করে বাড়ি ফিরে মনে করেছিলাম সবাই আমাদেরকে রিসিভ করবে। কিন্তু কেউ আমাদের আনতেও আসলো না। খেলায় হেরে গিয়ে কষ্ট পাইনি, কিন্তু এলাকার মানুষের অবহেলা বেশি কষ্ট দিয়েছে।

তারা আরও জানায়, ফুটবল ফেডারেশন ও সরকার যদি আমাদের ভালোভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আমরা একদিন জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বে ফুটবলের গৌরব অর্জন করতে পারবো নিশ্চয়ই।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রশিদ হাসিমুখে বললেন, আমগোর এলাকার মেয়েরা আমগর এলাকাডারে গোটা দেশেই চিনাইছে। ওরা যে এমন ভালো খেলবো তা আমরা চিন্তাও করতে পারি নাই। ওদের সাফল্যে আমরা আনন্দিত।

jagonews24

রাঙ্গাটুঙ্গী ফুটবল একাডেমীর কর্ণধার অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম জানান, জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত খেলায় রাঙ্গাটুঙ্গীর মেয়েরা রার্নাস আপ হয়ে গৌরব অর্জন করেছে। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ক্ষুদে ফুটবলারদের ট্রেন ও বাসে করে ঘরে ফিরতে হয়েছে অবশেষে। এই দারিদ্র পরিবারের প্রমিলা ফুটবলারদের খবর দেশব্যাপি নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এলাকার মানুষই তা জানে না।

তিনি বলেন, আমি মনে করি রাঙ্গাটুঙ্গীর কমপক্ষে ৭ জন ফুটবলার মেধা ও যোগ্যতা দিয়েই জাতীয় মহিলা ফুটবল টিমে জায়গা করে নেবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফএ) সভাপতি মিজানুর রহমান জানান, তাদের বাড়ি ফেরার বিষয়ে আমি অবগত নই।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল ও রানীংশকৈল উপজেলা নিবার্হী অফিসার নাহিদ হাসান জানান, প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েরা ঠাকুরগাঁওকে দেশব্যাপী চিনিয়ে দিয়েছে। খেলতে যাওয়ার আগে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছে প্রশাসন। এই ক্ষুদে ফুটবলারদের ঠাকুরগাঁওয়ে বিশাল আয়োজন করে সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা ক্রীড়া সংস্থা।

প্রসঙ্গ, গত শুক্রবার জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় নারী ফুটবল চূড়ান্ত পর্বে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর নারী ফুটবলাদের কাছে ৩-০ গোলে হেরে রানার্স আপ ট্রফি অর্জন করেছে ঠাকুরগাঁও রাঙ্গাটুঙ্গীর মেয়েরা। তৃতীয়বারের মতো হ্যাটট্রিক শিরোপা ধরে রাখল ময়মনসিংহের নারী ফুটবলাররা।

উপজেলার দুর্গম প্রত্যন্ত পল্লীর এ মেয়ে ফুটবলাররাই দেশের ফুটবলে আশার আলো হয়ে উঠেছেন। তাদের নজরকাড়া পারফরম্যান্সে বেজায় খুশি তাদের বাবা-মা। আনন্দে উদ্বেল স্থানীয় এলাকাবাসীও।

রবিউল এহসান রিপন/এমএএস/আরআইপি

আরও পড়ুন