ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ঈদের ব্যস্ততায় মুখর সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লী

প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ১৩ জুলাই ২০১৫

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লীগুলো কর্মমুখর হয়ে উঠেছে। চাহিদা অনুযায়ী ঈদের পোশাক তৈরিতে এখন তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার তাঁত ফ্যাক্টরিগুলোতে তৈরি হচ্ছে উন্নত আধুনিক রুচিশীল কাপড়সহ ঈদ পোশাক।

জামদানি, সুতি জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, বেনারসি, শেড শাড়ি, লুঙ্গিসহ নানা ধরনের পোশাক তৈরি হচ্ছে এখানে। শাড়ির ওপরে বর্ণিল সুতা, বাক ও চুমকিরও কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া কাপড়ের ওপর প্রিন্টসহ রংতুলি দিয়ে নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর নানা নকশাও দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন নকশার তৈরি কাপড়ের চাহিদা এখন দেশ ছাড়িয়ে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে ভারত, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরের খুকনীর তৈরি বেনারসি শাড়ি দেশে বিদেশে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যে কারণে ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁত কারখানার মালিকরা। কাপড়ের উৎপাদন বাড়াতে দিনরাত কাজ করে চলেছেন তাঁত শ্রমিকরা। কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের কোলাহলে সরব হয়ে উঠেছে তাঁতপল্লী। তাঁতের খট-খট, ঝুম ঝুম শব্দ জানান দিচ্ছে সামনে ঈদের আসছে। কাপড়ের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দামও বেড়েছে অনেক। দাম বেশি হলেও চাহিদার কোনো কমতি না থাকায় বেজায় খুশি তাঁত মালিক, শ্রমিকসহ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।

জেলার তাঁত প্রধান এলাকা হিসেবে খ্যাত বেলকুচির শেরনগর, চন্দনগাঁতী বসুন্ধারা, তামাই, এনায়েতপুরের খুকনি, বেতিল, এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তাঁতিরা কাপড় বুনছেন আপন মনে। কেউ কেউ আবার কাজের ফাঁকে ফাঁকে গানও গাচ্ছেন। তাঁত মালিকরা ব্যস্ত পাইকারদের নিয়ে। একই সঙ্গে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারী শ্রমিকরাও নলীভরা, সুতাপারি করা, মাড়দেয়া ও রংতুলিতে নকশা আঁকাসহ কাপড় বুননের কাজেও সহযোগিতা করছেন।

এদিকে, বিবিয়ানা, রং, কে-ক্রাফট ও নগরদোলাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বুটিক প্রতিষ্ঠানের কাপড় এখন সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে তৈরি হয়। বুটিক হাউসগুলোর নিজস্ব ডিজাইনে রেশম সুতা, খাদি, নয়েল, ডুপিয়ান ও অ্যান্ডি সুতা ব্যবহার করে তাতে প্যালেস ও জরি মিশ্রিত করে কাপড় তৈরি করা হচ্ছে। বুটিক হাউসের ওড়না, থান কাপড় ও অ্যান্ডি থান কাপড়ের ফেব্রিক্স তৈরি করা হচ্ছে এখানে। এ দিয়ে নানা ধরনের পোশাক তৈরি করছে বুটিক হাউসগুলো।

তরুণ-তরুণীদের কথা মাথায় রেখে তাঁতিরা উন্নতমানের জামদানি নকশা, শেড ও থান কাপড় তৈরি করছে। এ দিয়ে পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ আর ফতুয়া তৈরি হচ্ছে। জামদানি থ্রি-পিস দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা এবং চেক থ্রি-পিস ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অপরদিকে, ঈদকে সামনে রেখে ভারতের বাজারের সঙ্গে টক্কর দিতে ক্রেতাদের নজর কাড়তে ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সিরিয়ালের নাম অনুযায়ী কাপড়ের নাম রাখা হচ্ছে। এ বছরে টাপুর টুপুর, জল নুপুর, পায়েল, নন্দীনি, চোখের তারা, স্বর্ণলতা নামে নতুন শাড়ি বাজারে এনেছেন বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুরের তাঁতিরা। কাপড়গুলো হাফ সিল্কের ওপর ঝুটের মনোমুগ্ধকর নকশা করা। কাপড় খুললেই স্বর্ণের মতো ঝলমল করে বলেই এর নাম রাখা হয়েছে স্বর্ণলতা। ইতোমধ্যেই এ শাড়ি ক্রেতাদের মন কেড়েছে। বাজারে এর দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

worker

স্বর্ণলতা কাপড় প্রস্তুতকারক বেলকুচির দরগাপাড়া গ্রামের তাঁতি আলহাজ আজমল কবীর জাগো নিউজকে বলেন, রুচিশীল ক্রেতাদের বিষয়টি খেয়াল রেখেই ভারত থেকে জুট এনে তা দিয়ে হাতে বিভিন্ন নকশা করে স্বর্ণলতা শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এ শাড়ির প্রকৃত নাম সাউথ কাতান। ইতোমধ্যে বাজারে এ শাড়ির চাহিদা আকাশছোঁয়া। পাইকাররা অগ্রিম টাকা দিচ্ছে এ শাড়ির জন্য। চাহিদার কথা মাথায় রেখে তাঁতিরা দিনরাত এক করে এ কাপড় তৈরি করে যাচ্ছেন।

সিরাজগঞ্জ চেক ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার আব্দুল মান্নান মোল্লা জাগো নিউজকে জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের তৈরি কাপড়ের ব্যবসায় মন্দাভাব বিরাজ করছিল। গত বছর আন্দোলনের সময় এই অবস্থা আরো নাজুক হয়। একই সঙ্গে সুতা, রং ও তাঁত উপকরণের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি এবং ভারতীয় শাড়ির আগ্রাসনের কারণে এ শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। অনেক তাঁত মালিক তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বেকার হয়ে পড়েন অনেক তাঁতি। কিন্তু গত বৈশাখ আসার পর থেকে এ অবস্থার উন্নতি হয়। ধীরে ধীরে মন্দাভাব কাটতে শুরু করে। ঈদকে সামনে রেখে সেই অবস্থার আরো উন্নতি হয়।

মান্ধাতা আমলের বুননশৈলী বাদ দিয়ে ডিজাইনারদের পরামর্শে এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নতমানের জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, সুতি জামদানি, বেনারসি ও শেট শাড়ির পাশাপাশি মোটা শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস ও থান কাপড় তৈরি হচ্ছে এখানে। এসব শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে।

সোহাগপুর হাটের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী আলহাজ আশরাফুল আলম পল্টন জাগো নিউজকে জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সোহাগপুর, এনায়েতপুর ও শাহজাদপুর হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫ কোটি টাকার কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে এই শিল্প। মাত্র কিছুদিন আগেই যেখানে পথে বসার উপক্রম হয়েছিলো, সেখানে বিক্রি বাড়ার কারণে এখন পয়সার মুখ দেখতে পারছেন। এ ধারা অব্যহত থাকলে এই এলাকার তাঁত ব্যবসায়ীর ভাগ্য পরিবর্তনসহ দেশের উন্নয়নে ভালো ভুমিকা রাখবে এ শিল্প।

কলকাতা থেকে বেলকুচিতে কাপড় কিনতে আসা ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র সেন জাগো নিউজকে জানান, সিরাজগঞ্জের তৈরি কাপড় কলকাতা, গঙ্গারামপুর, পাটনাসহ ভারতের বড় বড় শহরে বিক্রি হচ্ছে। ভারতের চেয়ে এ দেশের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম, টেকসই এবং উন্নতমানের হওয়ায় তারা এখান থেকে কাপড় কিনছেন।

তিনি জানান, ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের লুঙ্গির চাহিদা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। তারা বাংলাদেশি লুঙ্গি ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যেও রফতানি করছেন।

বেলকুচির পাইকারি বিক্রেতা বসুন্ধারার রাজরাণী টেক্সটাইলের মালিক আব্দুল্লাহ জাগো নিউজকে জানান, দীর্ঘ মন্দার পর ঈদ সামনে রেখে কাপড়ের বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা অগ্রিম টাকা দিয়ে তাঁতিদের বাড়ি থেকে কাপড় নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক তাঁতিই তার কারখানার কাপড় আগাম বিক্রি করে দিচ্ছেন। যদিও কাপড় পাওয়া যায় তবে তার দাম অনেক বেশি।

ঈদকে সামনে রেখে দেশীয় এ শিল্পটি এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁতি, মালিক, পাইকারসহ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাঙালির নানা অনুষ্ঠানসহ ঈদ ও পুজার সময় তাঁতের সামগ্রী ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাগ্যের চাকারো পরিবর্তন হচ্ছে এই শিল্পের সঙ্গে সংযুক্তদের। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের পাশাপাশি এই শিল্পের মালামাল বিদেশে রফতানি করে দেশের উন্নয়নেও ভুমিকা অব্যহত রাখার কথা ব্যক্ত করেছেন এই শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

বাদল ভৌমিক/এমজেড/আরআই