ওই ফুল ফোটে বনে যাই মধু আহরণে
মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি, দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময় তো নাই- ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি দেখে ছোটবেলার ওই ছড়াটির কথা মনে পড়ে যায়।
টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে হলুদের সমারোহ। ফুটেছে সরিষার ফুল। তাই মৌমাছিদের যেন কোনো ফুরসত নেই। মহাব্যস্ত এখন তারা মধু আহরণে। ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে দলে দলে তারা ছুটে যাচ্ছে দূর বহু দূর। উড়ে উড়ে ফুল থেকে মধু চুষে নিয়ে আবার আসছে ফিরে।
সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণে ব্যস্ত মৌচাষিরা। মাঠে মাঠে এখন চলছে মধু সংগ্রহের কাজ। মাঠের পর মাঠ হলুদ রঙয়ে ভরে গেছে শীতকালীন সোনার শস্য সরিষার খেত।
টাঙ্গাইলে রবি মৌসুমে সরিষা খেতের পাশে মৌচাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌচাষিরা টাঙ্গাইলের সরিষা খেতের আশপাশে মধু সংগ্রহের জন্যে ভিড় করেন।

এ বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে সাত হাজারেরও বেশি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছে মধুচাষিরা। এখান থেকে সংগৃহীত মধু তারা বাজারে বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা আধুনিক না হওয়ায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মৌচাষিরা।
টাঙ্গাইল জেলায় চলতি মৌসুমে ২৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। জেলার সর্বত্র সরিষার আবাদের কারণে জেলার মৌচাষি ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌচাষিরা এবারও টাঙ্গাইলে মধু সংগ্রহের জন্যে ভিড় করেন।
জেলার ১২টি উপজেলার মধুপুর ও কালিহাতী ব্যতীত অন্য ১০টি উপজেলায়ই সরিষা খেতের পাশে মৌচাষিরা সারিবদ্ধ মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন। মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌ-বাক্সে জমা করছে।
আর মৌচাষিরা বাক্সে জমা হওয়া মধু প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ওই মধু ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে বিদেশেও। মৌচাষের মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নতি না হওয়ায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা।
মাত্র কয়েক বছর আগেও টাঙ্গাইলের সরিষা চাষিরা ফলন কম হবে এ ধারণায় সরিষা খেতের পাশে মৌ-বাক্স স্থাপনে বাধা দিতেন। জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তাদের সে ধারণা পাল্টেছে। এখন মৌ-বাক্স স্থাপনে বাধা না দিয়ে বরং উৎসাহ যোগাচ্ছেন তারা।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বড় বাসালিয়া গ্রামে মধুচাষ করতে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হলেও এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একমাস দেরিতে মধু সংগ্রহ শুরু করতে হয়েছে। এ বছর তার তিন টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
মির্জাপুর উপজেলার পাথরঘাটায় মৌচাষ করতে আসা সাতক্ষীরার ইসহাক মিয়া জানান, তিনি গাজীপুরে খামারের কর্মচারী হিসেবে মধু চাষ শুরু করেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫০টি মৌ-বাক্স দিয়ে নিজেই মধু চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ২৬টি মৌ-বাক্সের সারি আছে। প্রতি বাক্স থেকে সিজনে সর্বোচ্চ ৭০ কেজি মধু সংগ্রহ করতে পারেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, মধু উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক। এ বছর জেলায় ২৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল জেলার ১২ উপজেলায় সাত হাজারের বেশি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে।
সরিষায় ফুল থাকা পর্যন্ত এসব বাক্সে মধু সংগ্রহ অব্যাহত থাকবে। আগামীতে মৌচাষির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চাষিদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সব সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি ও ক্রেতাদের কাছে মধুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মৌচাষিদের প্রযুক্তিগত উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে দেশে যে পরিমাণ মধু উৎপাদন হবে, তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এএম/এমএস