ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সুখি সালমা এখন দুঃখী ভিক্ষুক

রিপন দে | মৌলভীবাজার | প্রকাশিত: ০৫:৪৬ পিএম, ১৭ মার্চ ২০১৮

স্বামী নুর ইসলাম সারাদিন ভ্যান চালিয়ে রাতে বাড়িতে ফিরেন। এর আগে স্ত্রী সালমা বেগম রান্না-বান্না শেষে সাজিয়ে রাখতেন বিছানার উপর। একপাশে পাশে বসে অপেক্ষা করতেন স্বামী নুর ইসলাম কখন বাড়ি ফিরবেন। স্বামীর ভ্যানের বেলের শব্দ শুনলেই ঘর থেকে দৌড়ে বের হতেন সালমা। উঠোনে বের হয়েই স্বামীর হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা নিতেন হাসি মুখে। এরপর হাত মুখ ধোয়ার জন্য প্লাস্টিলের পানি ভর্তি জগ এগিয়ে দিতেন স্বামীকে। সেই সঙ্গে তাড়া দিতেন তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসার। এও বলতেন, ‘সারাদিন অনেক ধকল গেছে শরীরের উপর দিয়ে।’

jagonews24

নুর ইসলাম খেতে বসলে গরমের সময় যেমনি পাখা দিয়ে বাতাস করে দিতেন, ঠিক তেমনি শীতের দিনে স্বামীকে যেন ঠান্ডা না লাগে এজন্য গরম পানি করে রাখতেন। এমনই ছিল স্বামী-স্ত্রীর নিত্য দিনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাময় সংসার। সেই সুখের সংসার আর নেই সালমার। ৫ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর পাল্টে গেছে তার জীবন। এখন আর তিনি রান্না-বান্না করে কারও জন্য অপেক্ষা করেন না, কাউকে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য পানির জগও এগিয়ে দেন না। যত সুখ ছিল সব স্বামী থাকাবস্থায়। এখন সেই সালমা বেগমের দিন কাটছে ভিক্ষা করে। অনাহারে অর্ধাহারে।

সালমা বেগম (৫০) রোজ সকালে পান্তা খেয়ে বাড়ি থেকে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে বের জন। তিনি শমসেরনগরের বাসিন্দা হলেও ভিক্ষার জন্য শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে যান। কারণ এখানে যাত্রী বেশি, আয়ও বেশি। সারাদিন ভিক্ষা করে ১০০/১৫০ টাকা আয় হয় তার। আর তা দিয়েই চলে তার একার সংসার।

jagonews24

সালমা বেগম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগরের বাসিন্দা। ১৫ বছর বয়সে ভ্যানচালক নুর ইসলামের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ৫ বছর আগে চিকিৎসার অভাবে স্বামী নরু ইসলাম মারা যান শ্বাস কষ্টজনিত সমস্যায়। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কমলগঞ্জের মুন্সিবাজারে। মেয়ের ঘরের দুই নাতি তার। ঈদে তাদেরকে নতুন কাপড় কিনে দেন তার সামান্য আয় থেকেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতেন। কিন্তু ২ বছর আগে পায়ে কি যেন রোগ হয় (রোগের নাম ভুলে গেছেন) এবং সেই রোগ থেকেই এখন ডান পা প্যারালাইজড। তাই আর কাজ করতে পারেন না। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধেও আসতে হয়েছে ভিক্ষার মতো অসম্মানজনক পেশায়।

সালমা বেগম শমসের নগরে ছোট একটি খুপরি ঘরে ভাড়া থাকেন মাসে ৬০০ টাকায়। রাতে এক বেলা রান্না করেন। সকালে তা থেকেই পান্তা ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়েন। বিয়ের পর থেকেই ভ্যানচালক স্বামীর সংসারে খুব কাছ থেকে দেখেছেন অভাবের কি যন্ত্রণা। অভাবের জন্য স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারেন নি তিনি। এখন নিজের এক পা প্যারালাইজড হয়েছে শুধুমাত্র চিকিৎসা না করানোর ফলে।

jagonews24

মাঝে মাঝে শরীর খুব খারাপ হয়, ইচ্ছে হয় না বিছানা থেকে উঠতে, কিন্তু একদিন ভিক্ষা না করা মানে সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়। কত রাত শুধু এক/দুই গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমিছেন তার হিসাব করতে পারছেন না তিনি।

অভাবের মাঝেও ভুলেননি নিজের দায়িত্ব। মেয়ের জামাই, মেয়েসহ দুই নাতিকে প্রতি ঈদে কাপড় কিনে দেন। রোজায় ইফতারি নিয়ে যান। মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখতে যান। যাবার সময় ২০ টাকা দিয়ে ২০টা চকলেটও কিনে নেন দুই নাতির জন্য।

মেয়ে বা মেয়ের জামাই সাহায্য করে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের নিজেদের অভাবের সংসার, আমাকে কীভাবে দেবে। অভাব কি জিনিস তা আমি ছোটবেলা থেকেই জানি।

সালমা বলেন, একটা বিধবা ভাতার কার্ড হলে অন্তত পায়ের চিকিৎসা করতে পারতাম।

এমএএস/আরআইপি