কক্সবাজারে পানিবন্দিদের দুর্ভোগ বাড়ছে
কক্সবাজারে ভারী বর্ষণ থামছে না। রোববার ভোর থেকে চলছে মুষলধারে বৃষ্টিপাত। এতে জেলার পাঁচটি নদীতে বাড়ছে ঢলের তীব্রতা। সাম্প্রতিক বন্যার ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ক্রমে পানি বাড়তে থাকায় ডুবে যাচ্ছে হাজারো ঘরবাড়ি। এতে ধীরে ধীরে পানিবন্দির ভয়াবহতা বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে দুর্ভোগ আর আতঙ্কও।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্র জানা যায়, রোববার ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় ১৫২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ভারী বর্ষণ ও সাগর উত্তাল রয়েছে। কক্সবাজার উপকূলকে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত আরো কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম নাজমুল হক।
সরেজমিন দেখা যায়, ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট ঢলের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া, খরুলিয়া, দরগাহপাড়া, পোকখালীর মধ্যম পোকখালী, নাইক্ষংদিয়া, চৌফলদন্ডী, নতুন মহাল, ঈদগাঁওর মাইজপাড়া, ভাদিতলা, ভোমরিয়াঘোনা, কানিয়ারছরা, ঈদগাঁও বাজার এলাকা, কালিরছড়া, রামুর ধলিরছরা, রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা, উত্তর মিঠাছড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম মেরংলোয়া, চাকমারকুল, কলঘর, লিংকরোড, চকরিয়ার ভাঙারমুখ, ফাসিয়াখালী, মালুমঘাট, ডুলহাজারা, খুটাখালী, ফুলছড়ি, ইসলামপুরের বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় পানি সড়কের সমান্তরালে অবস্থান করছে। খুটাখালী, কালিরছড়া, মালুমঘাট, রামু বাইপাসসহ আরো একাধিক স্থানে ঝড়ো হাওয়ায় মহাসড়কে উপড়ে পড়েছে বিশালাকারের গাছ। একই পরিস্থিতি টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কেও। এসব কারণে উভয় সড়কে যানচলাচল বেশ কিছু সময় বন্ধ ছিল। পড়ে যাওয়া গাছ কেটে চলাচল স্বাভাবিক করে প্রশাসন।
রামু উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগ সভাপতি রিয়াযুল আলম জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত যতো বাড়ছে বাঁকখালী নদীতে ততো বাড়ছে ঢলের তীব্রতা। গত বন্যায় ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে পানি। এতে ফতেখারকূল, কাউয়াকূপ, কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, চাকমারকূল, জোয়ারিয়ানালা ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে হাজারো বসতবাড়ি। ডুবে আছে উপজেলা সদর ও গ্রামের সড়ক-উপ-সড়ক। অনেক সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এখনো কাটেনি। বাড়িঘর ডুবে থাকায় দুর্ভোগে পড়া লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাহেদুল ইসলাম জানান, উপজেলার বমু বিলছড়ি মানিকপুর-সুরাজপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙা, কৈয়ারবিল, বরইতলী, শাহারবিল, পূর্ব বড়ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী ও হারবাং ইউনিয়নে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। গত ৩০ জুনের বন্যায় ভাঙনের কবলে পড়া বেড়িবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে ঢলের পানি। আবারো ভেঙে গেছে চিরিঙা ইউনিয়নের সওদাগর ঘোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ। সুরাজপুর-মানিকপুর সড়ক ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। যেভাবে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে তাতে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলম এমএ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মাতামুহুরী নদীর পানি ক্রমে বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়া লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু জানান, পেকুয়া উপজেলা সদর, বারবাকিয়া ও শীলখালীসহ নিম্নাঞ্চল আবারো প্লাবিত হচ্ছে। সড়কের উপর দিয়ে পানি চলাচল করায় বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ।
উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও রাজাপালং ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, পাহাড়ী ঢল ও নাফ নদীর জোয়ারের পানিতে একাকার হয়ে গেছে প্রায় ১২শ একর চিংড়ি ঘের। উখিয়ায় সড়কে গাছ পড়ে ও কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের বেশ কয়েকটি এলাকার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে শনিবার মধ্যরাত থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। উপজেলার রেজু খাল দিয়ে বিপদসীমার উপর পানি প্রবাহিত হওয়া দু’পাড়ে বসবাসরত প্রায় দুই শতাধিক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ১৮টি গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মহেশখালীতে সড়ক ভাঙনের কবলে পড়ায় বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। টানা বর্ষণের কারণে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টাও করা যাচ্ছে না বলে জানান উপজেলা চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিকদার।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জাগো নিউজকে জানান, ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় বন্যা স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রাণহানি ঠেকাতে প্লাবিত এলাকায় প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো হয়েছে। 
এছাড়াও পাহাড় ধসের আশঙ্কায় শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজনকে সরে যেতে প্রশাসনের একটি বিশেষ দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিদের্শনা দিয়েছে। বেধে দেয়া সময় মতো তারা সরে না গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের সব বিভাগ তৎপর রয়েছে বলে উলেখ করেন তিনি।
সায়ীদ আলমগীর/বিএ