ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

প্রেমিক থেকে ডাকাত সর্দার হওয়ার গল্প শোনালেন শিশু মিয়া

জেলা প্রতিনিধি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া | প্রকাশিত: ০৮:৫৮ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০১৮

প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি কাহিনি থাকে। কারও জীবনে থাকে সুখের কাহিনি, কারও বা দুঃখের। আর এসব কাহিনিতে কেউ থাকেন হিরো, কেউ বা হয়ে যান ভিলেন। জাগো নিউজের হাতে এমনি একটি কাহিনি এসেছে। এ কাহিনিতে একজন ব্যক্তি প্রেমিক থেকে কীভাবে ডাকাতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন সেটিই তুলে ধরা হলো পাঠকের জন্য।

প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো কারণে অপরাধের জগতে পা বাড়ান। ঘটনাক্রমে অপরাধে জড়ানো মানুষগুলো পরোক্ষভাবে হলেও আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করে থাকেন। তেমনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. শিশু মিয়ারও (৫৫) অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর পেছনে একটি কারণ রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে প্রেমের কারণে ডাকাত দলে যোগ দিয়েছিলেন শিশু মিয়া।

প্রথমে ডাকাত দলের সদস্য, পরবর্তীতে হয়ে উঠেন ডাকাতদের সর্দার। ডাকাতির পাশাপাশি মাদক ব্যবসাও করেছেন বেশ কয়েক বছর। তবে সবকিছু ছেড়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় এখন অন্য আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন শিশু মিয়া। সারাদিন অটোরিকশা চালিয়ে যা রোজগার করেন তাতেই চলে যায় শিশু মিয়ার সংসার।

কীভাবে প্রেমিক থেকে ডাকাত হয়ে উঠেছিলেন এবং কীভাবেই বা সুপথে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন সেই গল্প জাগো নিউজকে শুনিয়েছেন শিশু মিয়া। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা প্রাঙ্গণে জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় শিশু মিয়ার।

তিনি বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় আগে সদর উপজেলার নন্দনপুর বাজারে ছোট্ট একটি পানের দোকান ছিল তার। তখন আমিরুন খাতুন নামে এক কিশোরীর প্রেমে পড়েন টগবগে যুবক শিশু মিয়া। পান নেয়ার অজুহাতে ওই কিশোরী প্রায়ই আসতেন শিশু মিয়ার দোকানে। এভাবে বেশ কয়েকদিন চলার পর দুজনের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা শুরু হয়। এরপর চলে একে অপরের মধ্যে মন দেয়া-নেয়া। আমিরুন খাতুন ছিলেন শিশু মিয়ার প্রতিবেশী। প্রায় বছর খানেক প্রেম করার পর দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে বিয়ে করার। কেননা দুই পরিবারের কেউই তাদের বিয়ে মেনে নেবেন না। এজন্য আমিরুন খাতুনকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে পালিয়ে যান শিশু মিয়া। ঘটনাটি কত সালের সেটি স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

তবে পালিয়ে গিয়েও রেহাই পাননি শিশু মিয়া ও আমিরুন খাতুন। বিয়ে করার আগেই আমিরুন খাতুনের ভাই নোয়াগাঁও থেকে তাদের মারধর করে ধরে নিয়ে আসেন নন্দনপুর গ্রামে। পরবর্তীতে উভয়পক্ষের লোকজনের উপস্থিতিতে গ্রামে সালিশ বৈঠক হয়। ওই সালিশ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পারিবারিকভাবে দুইজনের বিয়ে দেয়ার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়ে হলেও আমিরুন খাতুনের চাচাতো ভাই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ধন মিয়া বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। শিশু মিয়ার চাচা লাল মিয়াও বিয়েটি মানতে পারেননি। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারি ও মামলা মোকদ্দমা চলতে থাকে। বিয়ের দুই বছর পর তৃতীয়বারের মতো গর্ভবতী অবস্থায় জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দুই সন্তানের জননী আমিরুন খাতুন। পরবর্তীতে শিশু মিয়া আরেকটি বিয়ে করেন।

শিশু মিয়া বলেন, আমিরুনের চাচাতো ভাই ধন মিয়া ও তার পরিবারের লোকজন বিত্তশালী ছিলেন। গ্রামের সবাই তাদের কথামতোই চলতো। বিয়ের পর আমার বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিতে শুরু করে। তখন আমি কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হলেই পুলিশ ধরে নিয়ে যেত। মামলা-মোকদ্দমার কারণে কোথাও কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না। পরে বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে ডাকাতির পথ বেছে নিয়েছিলাম। প্রথমে আমিরুন আমাকে বাধা দিত। আমার কোনো কাজকর্ম নেই তাই ডাকাতি করি বলে তাকে বকাঝকা করতাম। এভাবে বেশ কয়েক বছর বাড়ি-ঘর ও রাস্তায় ডাকাতি করেছি। তবে ডাকাতি করতে গিয়ে কোনো মানুষকে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করিনি। আমার দ্বারা কেউ কোনোদিন জখম হয়নি। আমাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল বলেই বাধ্য হয়ে ডাকাতি করেছি। ডাকাতির মামলায় ৮/১০ বার জেলও খেটেছি।

১০/১৫ বছর ডাকাতির পর নন্দনপুর বাজারে পাহারাদারের চাকরি নেন ডাকাত সর্দার শিশু মিয়া। তখনই মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।

এর মধ্যে তৎকালীন সরাইল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইশতিয়াক আহমেদ ডাকাতির মামলায় শিশু মিয়াকে গ্রেফতার করেন। শিশু মিয়ার জীবনের গল্প শুনে তাকে সবকিছু ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বলেন এসআই ইশতিয়াক। বর্তমানে তিনি সদর মডেল থানায় কর্মরত আছেন। শিশু মিয়াকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন এসআই ইশতিয়াক। তার মাধ্যমেই শিশু মিয়া জেল থেকে বেরিয়ে চলে যান তাবলীগ জামাতে। অন্ধকার জগত ছেড়ে প্রায় ৫ বছর ধরে এখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছেন শিশু মিয়া।

ছেলেরা সংসারের খরচ মেটালেও শিশু মিয়া নিজে কিছু করবে বলে এখন অটোরিকশা চালান। নন্দনপুর বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর পর্যন্ত অটোরিকশা চালান তিনি।

সুপথে ফিরে আত্মতৃপ্ত শিশু মিয়া এখন স্ত্রী, পাঁচ ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সুখেই আছেন। তবে এখনও সদর ও সরাইল থানায় পূর্বের কয়েকটি মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে তাকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইশতিয়াক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, শিশু মিয়াকে কথা দিয়েছিলাম স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সব ধরণের সহযোগিতা করবো। শিশু মিয়ার ইচ্ছা ছিল বলেই সবকিছু সম্ভব হয়েছে এবং তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে এখনও যে মামলাগুলো রয়ে গেছে সেগুলো কীভাবে শেষ করা যায় এ জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। আমরা চাই শিশু মিয়াকে দেখে অন্য অপরাধীরাও যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

আজিজুল সঞ্চয়/এমএএস/এমএস

আরও পড়ুন