পদ্মাপাড়ের ‘স্বপ্নের বাড়ি’
‘স্বপ্নের বাড়ি’ নামটি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলোরই দেয়া। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার চরভাগা ইউনিয়নের মনাই হাওলাদার কান্দি গ্রামের পদ্মাপারে খুঁটিতে বাঁধা ভাসমান বাড়ি তিনটি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিআর) একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই তিনটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়িটির গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক আইনুন নিশাত। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান কুশলী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শুভ্র দাশ ভৌমিকের নেতৃত্বে স্থানীয় কারিগরেরা বাঁশ দিয়ে বাড়িগুলো নির্মাণ করেছেন।
বাড়ির নকশা ও পরিকল্পনায় ছিলেন যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক নন্দন মুখার্জি। বাড়িগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহায়তা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান ও তার দল।

মনাই হাওলাদার কান্দি গ্রামের বাসিন্দাদের চাহিদা ও পরামর্শকে আমলে নিয়ে বাড়ির নকশা তৈরি করেছেন সি-থ্রি-আরের কর্মীরা। গ্রামের ছয়টি পরিবারকে বাড়িগুলো বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। চারটি পরিবার সেখানে থাকছেন, বাকি দুটি পরিবার বাড়ির মুরগির খামার ও সবজিবাগান রক্ষণাবেক্ষণ করছে। বাড়িগুলো থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে, যা ছয়টি পরিবার সমানভাবে ভাগ করে নিচ্ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এই প্রথম ভিন্নধর্মী পদ্ধতিতে এ বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। শরীয়তপুর জেলাসহ অন্যান্য জেলা থেকে ট্রলার, নৌকা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দিয়ে বাড়ি তিনটি দেখতে আসেন মানুষ। প্রতিদিন বিকেলে পদ্মাপাড়ে বাড়িগুলো সামনের স্থান মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়।
এখানেই চটপটি, ফুসকা, ঝালমুড়ি, আচার, কয়েকটি মুদি দোকানও বসেছে। কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক বেকার যুবকদের।
বন্যা এলেই পদ্মাপাড়ের প্রতিটি বাড়ি যখন ডুবে যায় তখন স্বপ্নের বাড়িগুলো ভেসে থাকে। বাঁশের তৈরি বাড়িগুলো এ বছর বন্যায় ডোবেনি। নদীতে পানি বাড়লেও সেটি ভেসে ছিল। এমনকি বন্যায় জীবন সঙ্কটের মুখে পড়ে তখন স্থানীয় অনেকেই স্বপ্নের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
সরেজমিনে বাঁশ ও কাঠের তৈরি ঝুলন্ত সিঁড়ি দিয়ে বাড়িগুলোর ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো কোনো এক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগৎ। ঘরের চারপাশের দেয়ালে সারি সারি গাছের চারা, ড্রামভর্তি মাছের পোনা। এক কোণায় ঘুরছে ছোট্ট দুইটি টারবাইন। মাঝখানে ছোট্ট একটি উঠানও আছে, পাশেই মুরগির খামার। বাড়িতে জ্বালানি, খাদ্য ও সুপেয় পানির বন্দোবস্তও রয়েছে।
ছাদে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বড় ট্যাংক আর সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। আছে দুটি শোয়ার ঘর, একটি বৈঠকখানা ও রান্নাঘর। আছে উন্নতমানের সৌচাগারও। পাশ দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা গেলে ঢেউ এসে বাড়িতে ধাক্কা দেয়। তখন এটি হেলেদুলে ওঠে।
বাড়িগুলো এমন পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে যা বন্যায় ডুববে না, ঝড়ে উড়ে যাবে না, ভূমিকম্পে ভাঙবে না। প্রতিটি বাড়ির আয়তন প্রায় দুই শতাংশ। বাড়ি তিনটি ওই এলাকার বুলবুলি বেগম, আমিরুন বেগম, জাহাঙ্গীর হোসেন, হাকিম মিয়া, সেকেন্দার ও নাজিম হাওলাদার নামে ছয়জন হতদরিদ্রকে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে দুইটি পরিবার বসবাস করছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি বাড়ি তৈরিতে গড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে এখন তা ৫ লাখ টাকায় বানানো সম্ভব। বাড়ির নির্মাণকৌশল ও নকশা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। যাতে যে কেউ এ ধরনের বাড়ি বানাতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে এমন বাড়ি নির্মাণ করতে খরচ ৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
বাড়িতে বসবাসকারী বুলবুলি বেগম (৪৫) বলেন, আমার স্বামী অন্ধ। পরিবারে আয় রোজগারের কেউ নাই। এক খণ্ড জমিও নেই যে থাকব। তাই স্বপ্নের বাড়িতে আমাদের থাকতে দিয়েছে। আমরা এখানে মুরগি পালি ও শাক শবজি চাষ করি। এখান থেকে ভালোই আয় হয়। তা দিয়েই সংসার চলে।
বাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সেকেন্দার বলেন, বাড়িগুলো বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন ৩শ থেকে ৫শ লোক দেখতে আশে এ ‘স্বপ্নের বাড়ি’।
ছগির হোসেন/এফএ/আরআইপি
আরও পড়ুন
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ চট্টগ্রামে ১১ দলীয় জোটের আসন বণ্টন, ১৬ আসনে জামায়াতের ভাগে ৯
- ২ আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বিএনপি সমর্থককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা
- ৩ ফরিদপুরে ঐতিহ্যবাহী গরুদৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
- ৪ সুনামগঞ্জে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন বিএনপি ও এবি পার্টির প্রার্থী
- ৫ আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় মিন্টুর ভাই আকবরকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা