ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

৪৬ বছর পর স্বজনদের ফিরে পেলেন ইদ্রিস

জেলা প্রতিনিধি | ফরিদপুর | প্রকাশিত: ০৯:৩৭ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দীর্ঘ ৪৬ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বটরকান্দা গ্রামের গোপাল শেখ ও কালাবুড়ির হারিয়ে যাওয়া সন্তান ইদ্রিস আলী। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে খাদ্যের খুব অভাব দেখা দেয়। সেই অভাবের কারণে চাচা মোমিন শেখের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হন ১১ বছরের ইদ্রিস আলী।

৪৬ বছর পর পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ইদ্রিস আলী খুঁজে পান তার জন্মস্থান। তবে দীর্ঘদিন পর গত শনিবার বাড়িতে এলেও দেখা পেলেন না তার বাবা-মায়ের। বাবা মারা গেছেন বহুদিন আগে আর মা মাত্র দুই বছর আগে মারা গেছেন। একমাত্র বড় ভাই আবু তালেবকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইদ্রিস আলী। ছোট ভাইকে ফিরে পেয়ে বড় ভাই আবু তালেবও কাঁদলেন আনন্দের কান্না।

চুয়াডাঙ্গা জেলায় গিয়ে পেটের দায়ে মানুষের বাড়িতে ১৩ বছর মহিষ চরানোসহ যাবতীয় কৃষি কাজ করে বেড়ে ওঠেন ইদ্রিস আলী। এরমধ্যে জন্মস্থানের কথা মনে পড়লেও সঠিকভাবে ঠিকানা বলতে পারতেন না। বয়স যখন ২৪, স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় জহুরা আক্তারকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন তিনি। দুটি মেয়ে সন্তান নিয়ে কোনো মতে সংসার চলে।

ইদ্রিস আলী বলেন, যুদ্ধের পর অভাবের জন্য মা ও ভাইকে রেখে চাচার সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। চাচা ও তার পরিবার দিনাজপুর যাওয়ার সময় কুষ্টিয়া রেলস্টেশনের একটি হোটেলে আমাকে পেটে ভাতে রেখে যান। কিন্তু কয়েকদিন পরই হোটেলটি ভেঙে দেয়। তখন সবাই যার যার মতো চলে যায়। আমিই একা পড়ে যাই। কাঁদতে কাঁদতে ট্রেনে চড়ে একটি শহরে চলে যাই। শহরের মোমিনপুর রেলস্টেশনে নেমে ক্ষুধায় যখন কাঁদছিলাম এক লোক এসে আমার বাড়ি কোথায়, ক্ষুধা লেগেছে কিনা জানতে চান। পরে তিনি আমাকে নিয়ে একটি হোটেল থেকে রুটি খাওয়ান। খাওয়া শেষে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি আমি কুষ্টিয়া জেলার কোতয়ালি থানার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামে মন্টু মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছি।

কয়েকদিন পর মন্টু মিয়া আমাকে তার বাড়ির পাশে মাহতাব উদ্দীন বিশ্বাসের বাড়িতে রাখালের কাজ ঠিক করে দেন। অনেক কষ্টের মাঝে চলতে থাকে আমার জীবন। রাতে মা ও ভাইয়ের কথা মনে হলেই কাঁদতাম। অনেককেই আমার বাবা, ভাই, গ্রাম বটরকান্দা ও তার আশপাশের রামকান্তপুর, চাউলিয়া, বিভাগদি গ্রামের কথা বলি। কিন্তু জেলা ও থানার নাম আমি বলতে পারি না বলে আমার মা ও ভাইয়ের সন্ধান কেউ বের করে দিতে পারেনি।

এভাবেই জীবন চলতে থাকলেও মা ও ভাইকে ভুলতে পারিনি। অনেক লোককে বলি। অবশেষে গাজীপুরের কানইপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সহযোগিতায় নকুলহাটির মনিয়ার ও বটরকান্দার মুন্নু মাতুব্বারের মাধ্যমে আমি আমার গ্রামে ফিরেছি। আমার বড় ভাইকে পেয়েছি, কিন্তু পায়নি আমার মাকে।

ইদ্রিস আলীর বড় ভাই আবু তালেব জানান, অভাবের কারণে ইদ্রিসকে আমার চাচা একটি হোটেলে রেখে দেয়। ২৫ দিন পর চাচা বাড়ি এসে ওর ঠিকানা দিলে সেখানে ছুটে যাই। কিন্তু কুষ্টিয়া রেলস্টেশনে গিয়ে আমার ভাইকে পাইনি। তারপর থেকে অনেক খুঁজেও তাকে আর পাইনি। এক সময় আমরা ধরে নিয়েছিলাম ইদ্রিস হয়তো বেঁচে নেই। হঠাৎ ৩ দিন আগে আমাদের গ্রামের মুন্নু মাতুব্বার আমাকে বললো ইদ্রিসের সন্ধান পাওয়া গেছে।

শুক্রবার বিকেলে ফরিদপুর কোতয়ালি উপজেলার পিত্তাপপুর হাচান শাহের দরবার শরীফে পরিচয় ছাড়াই ইদ্রিসের মুখোমুখি হলাম। ওকে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার বাড়ি কোথায়। আমার কথার উত্তর না দিয়ে ও আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আপনার বাড়ি কোথায়। এক পর্যায়ে বললো আপনার মুখ খুলুন, ওর কথায় আমি হেসে দিলাম, তখনি বললো আপনি আমার তালেব ভাই। ছোটকালে গরুর আঘাতে আপনার সামনে উপরের একটি দাঁত ভেঙে যায়। একথা বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আমিও কেঁদে দিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমি বললাম আমার ছোট ভাই ইদ্রিসের বাম পায়ে হাঁটুর নিচে একটা বড় ক্ষত আছে। এ কথা বলতে না বলতেই পায়ের ক্ষত দেখাল। এ সময় আমরা দুই ভাই আনন্দে কাঁদতে থাকি।

বি কে সিকদার সজল/এফএ/এমকেএইচ

আরও পড়ুন