যে শঙ্কর কুমারের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আনোয়ারা
ফেনীতে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) বিভিন্ন প্রকল্পের ৭০ কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে উপ-পরিচালক শঙ্কর কুমার পালের খামখেয়ালিপনায় এসব পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সমবায়ীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এমনকি এর জেরে শুক্রবার রাতে ফুলগাজী উপজেলা বিআরডিবির সমন্বিত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির (পদাবিক) এক কর্মচারী আনোয়ারা বেগম উপ-পরিচালক ও সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে জেলা সদরসহ উপজেলা পর্যায়ের সবস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হঠাৎ বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে সংরক্ষিত বিভিন্ন তহবিল থেকে বেতন পরিশোধ করতে একই বছরে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের যুগ্ম-সচিব (পরিচালক- সরেজমিন) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আদেশ দেয়া হয়। কিন্তু আদেশের পরও ফেনীর বিআরডিবির উপ-পরিচালক শংকর কুমার পাল সংশ্লিষ্ট উপজেলা কর্মকর্তাদের বেতন বন্ধ রাখতে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। বেতন পরিশোধ করা হলে উপজেলা কর্মকর্তাদের বেতন থেকে তা কর্তন করা হবে বলেও হুমকি-ধমকি দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুলগাজী উপজেলায় মাঠকর্মী রয়েছেন ৫ জন। এদের মধ্যে আনোয়ারা বেগম (আত্মহত্যাকারী) ছাড়াও রয়েছেন অর্চনা রানী, শহীদুল্লাহ, কিবরিয়া ও রত্মা নামের ৪ কর্মী। তারাও বেতন পান না গত ৪ মাস। একই চিত্র জেলার অপরাপর উপজেলাগুলোতেও। এনিয়ে কেউ কিছু বলতেও সাহস পান না। যথাসময়ে ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলেও রীতিমত অসদাচরণ করেন উপ-পরিচালক শংকর কুমার। এমনকি কাউকেই তোয়াক্কা করেন না তিনি। কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তকে এড়িয়ে তিনি চলেন খেয়াল-খুশিমতো।
এসব বিষয়ে ফেনী জেলা আঞ্চলিক সমবায় ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট নুর হোসেন, জেলার ৬ উপজেলার কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ফেনী ইউসিসিএ লিমিটেডের সভাপতি সাহাব উদ্দিন সিকদার, পরশুরাম উপজেলা সভাপতি ইয়াছিন শরিফ মজুমদার, ছাগলনাইয়া উপজেলা সভাপতি মো. মুজিবুর রহমান, সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি মোহাম্মদ ফারুক হোসেন, ফুলগাজী উপজেলা সভাপতি মো. সেলিম, দাগনভূঞা উপজেলা সভাপতি বাবুল স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘অনেক সময় রাত ১০টা পর্যন্ত মহিলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসিয়ে রাখেন। এসব বিষয়ে কেউ মুখ খুললে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবেন বলে অধস্তনদের চাপের মুখে রাখেন। তার অনৈতিক আহ্বানে সাড়া না দিলে মহিলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে হয়রানিও করেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, উপ-পরিচালক শংকর কুমার পালের অসদাচরণ ও হুমকিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। অতিষ্ঠ হয়ে সমবায়ীরা অফিস বিমুখ হয়ে পড়েছেন। যার ফলে শেয়ার-সঞ্চয় জমা ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে স্থরিবরতা নেমে এসেছে।
একটি সূত্র জানায়, শংকর কুমার পালকে জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র বদলী করতে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলামকে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ফেনী কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সভাপতি নিজাম উদ্দিন হাজারী।
৩০ জানুয়ারি প্রেরিত ওই চিঠিতে নিজাম হাজারী আরও উল্লেখ করেন, ‘ফেনী জেলার ৬ উপজেলায় কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যকলাপ উপ-পরিচালক শংকর কুমার পালের দ্বারা বিঘ্নিত হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকারের অনৈতিক কার্যকলাপ ও অসদাচরণের অভিযোগ আছে। আমি অভিযোগ সমূহের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইয়াছি। ফেনী জেলার সকল কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি সমূহের কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু ও গতিশীল করার জন্য উপ-পরিচালক শংকর কুমার পালকে সমবায়ীদের স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র বদলি করার জন্য সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
অপর একটি সূত্র জানায়, চাকরিকালীন ৪ কর্মস্থল থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তোপের মুখে বিতাড়িত হন শংকর কুমার পাল। সর্বশেষ কুমিল্লা থেকে তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী (বর্তমানে অর্থমন্ত্রী) আ.হ.ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। এর আগে বান্দরবান ও হবিগঞ্জ জেলা থেকে তাকে চাপের মুখে অন্যত্র বদলি করা হয়।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় রুর্যাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার (আরডিও) থাকাকালীনও শাস্তিমূলক বদলি হন নোয়াখালীর এ বাসিন্দা।
জানতে চাইলে উপ-পরিচালক শংকর কুমার পাল বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়।
রাশেদুল হাসান/এফএ/এমএস