ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

আজও উপকূলবাসীকে তাড়ায় ভয়াল সেই স্মৃতি

সায়ীদ আলমগীর | কক্সবাজার | প্রকাশিত: ১০:৪১ এএম, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

২৬ এপ্রিল থেকে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হয়। বাড়িতে স্ত্রী, বড় সন্তান ও অসুস্থ বৃদ্ধা মা। কাঁচা রাস্তা হওয়ায় তাদের নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়াও দুরহ ছিল। অভাবের কারণে ডাক্তারকে বাড়ি আনাও সম্ভব হচ্ছিল না। অপেক্ষায় ছিলাম বৃষ্টিটা থামলে তিনজনকেই চিকিৎসকের কাছে নেব। ২৯ এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাস বৃষ্টি থামিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমার অসুস্থ স্বজনদের ডাক্তারের কাছে নেয়ার সুযোগ দেয়নি। প্রায় ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস তাদের সবার হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেয়। তাদের মরদেহগুলোও আর দেখা হয়নি। ২৮ বছরে এলাকার অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। সব হারিয়ে অন্য এলাকায় বাসা গড়েছি, তারপরও হারানো ধনদের স্মৃতি পিছু ছাড়ে না।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ টেকপাড়ার বাড়িতে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের রাতে স্বজন হারানোর সেই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন জহির আহমদ (৫৯)। তিনি সেদিন মা-সন্তান ও স্ত্রীসহ সব হারিয়েছিলেন।

শুধু তিনি নন, উপকূলের শত শত মানুষ তার মতো আপনজনকে হারিয়ে এখনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। প্রায় আড়াই যুগ সময় পেছনে ফেলে এসেছেন জলোচ্ছ্বাস আক্রান্ত মানুষ। কিন্তু হারানোর বেদনা তাদের কখনো নিস্তার দেয়নি।

১৯৯১ সালের এ দিনে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকা তছনছ করে মহা ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল। রাতের আঁধারে মুহূর্তের মধ্যে লন্ডভণ্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই অবস্থা। এর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি উপকূলের মানুষ আর কখনো হয়নি। তাই ১৯৯১ সালের পর থেকে ২৯ এপ্রিল এলেই স্বজনহারা মানুষের কান্নায় এখনও ভারি হয় উপকূলের পরিবেশ।

ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল আবহাওয়া বিভাগ উপকূলীয় এলাকায় ৯নং সতর্ক সংকেত জারি করলেও অজ্ঞতার বশে লোকজন অন্যত্র সরে না যাওয়ায় মহা দূর্যোগের শিকার হন। রাত ১০টার পর ১০ থেকে ২০ ফুট উচ্চতায় সাগরের পানি মুহূর্তেই ধেয়ে এসে লোকালয়ে প্রবেশ করে। জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলায় সব হারিয়ে নিঃস্ব হন অনেকে। অনেক পরিবার আছে যাদের গোটা পরিবারই পানির স্রোতে হারিয়ে গেছে।

প্রশাসনের হিসাব মতে, ভয়াল এই ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় ১৯ জেলার ১০২ থানা ও ৯টি পৌরসভায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন নিহত, ১২ হাজার ১২৫ জন নিখোঁজ ও ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪ জন আহত হন। ক্ষতি হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার।

১৯৯১ সালের এ দিনে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানী ঘটে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর উপ-দ্বীপ ধলঘাটা-মাতারবাড়ি, পেকুয়ার মগনামা ইউনিয়ন, কুতুবদিয়ার প্রায় পুরো উপজেলা এবং সদরের বৃহত্তর গোমাতলী এলাকায়। সেখানে অধিকাংশ বাড়ি থেকে পরিবারের ৫-৬ জন লোক মারা যান। অনেক যৌথ পরিবারে একসাথে ৪০ জন মারা গেছে এমনও রয়েছে।

এতকিছুর পরও কক্সবাজারের উপকূলে পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই। বিদ্যমান ৫ শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্রের অধিকাংশ ব্যবহার অনুপযোগী। শুধু সাইক্লোন শেল্টার নয়, উপকূলের ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে এসব উপকূলীয় বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছিল। ওই ভাঙা বাঁধ এখনো পরিপূর্ণ মেরামত হয়নি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সংস্কার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যক্রম চলছে। এছাড়াও নতুন আরও কেন্দ্র স্থাপনের জন্যও উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে দিবসটি পালনে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ স্মৃতি পরিষদ, কুতুবদিয়া ফাউন্ডেশনসহ নানা সংগঠন।

এফএ/এমকেএইচ

আরও পড়ুন