আদরের সন্তানকে হারিয়ে শয্যাশায়ী মা
আদরের সন্তানকে হারিয়ে এক সপ্তাহ ধরে শয্যাশায়ী মা। সন্তানের ছবি বুকে আগলে রেখেছেন মা, পাশে রেখেছেন সন্তানের স্কুলড্রেস ও পছন্দের জামা। কিছুক্ষণ পর পর চোখের পানি মোছেন, কাঁদতে কাঁদতে মাঝেমধ্যে জ্ঞান হারান, স্বজনেরা ভিন্ন কথা বলে মাকে সন্তানের কথা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সন্তানের নাম ধরে ডাক দিয়ে কান্না শুরু করেন মা। আবার মায়ের কান্নায় কাঁদে স্বজনরাও।
সন্তানকে হারিয়ে গত সাতদিন ধরে এভাবেই ছটফট করে দিন কাটাচ্ছেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী নাজমুন নাহার ঝুমুরের মা হোছনে আরা বেগম।
৪ মে স্কুলছাত্রী ঝুমুরকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। নিহত ঝুমুর ওই ইউনিয়নের তালতলী এলাকার আব্দুল হানিফের মেয়ে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তো ঝুমুর।
ঝুমুরকে ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মামলার একমাত্র আসামি বাহার উদ্দিন (৩৫)। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে ঝুমুরের গ্রামের বাড়ি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের তালতলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঝুমুরকে হারিয়ে এক সপ্তাহ ধরে শয্যাশায়ী মা হোছনে আরা বেগম। এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি তিনি। ডাক্তারের পরামর্শে তার হাতে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। সন্তানের ছবি বুকে রেখেছেন মা, পাশে রেখেছেন সন্তানের স্কুলড্রেস ও পছন্দের জামা। কিছুক্ষণ পর পর চোখের পানি মোছেন, কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারান। প্রতি মুহূর্তে ঝুমুরের কথা মনে পড়ছে তার।
মেয়ের ছবির দিকে ইঙ্গিত করে শয্যাশায়ী মা হোছনে আরা বেগম বলছেন, ঝুমুর বেঁচে আছে। স্কুলে যাওয়ার সময় হলে আমার কাছে আসবে ঝুমুর। এসে বলবে মা টিফিন বক্সে ভাত দাও। স্কুল ব্যাগটা ঠিক করে দাও। আমার চোখের সামনে ভাসছে ঝুমুর খেলছে, হাসছে এবং দৌড়াদৌড়ি করছে। আমি সবসময় দেখি বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করছে ঝুমুর।
চোখের পানি মুছতে মুছতে মা হোছনে আরা বেগম বলেন, আমাদের অভাব-অনটনের সংসার। নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাবার দিয়েছি। চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে ঝুমুর ছিল সবার ছোট। আদরের সন্তান নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাবে তা কোনো দিন ভাবতে পারিনি। আমার আদরের সন্তানকে যেভাবে নির্যাতন করে মারা হয়েছে আমিও চাই অপরাধীর কঠিন শাস্তি হোক। মেয়ে হত্যার বিচার পেতে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চাই আমি।
৪ মে রাতে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাড়ির আশপাশে প্রচুর আম পড়ে। শনিবার সকাল ৬টার দিকে দুই মামাতো বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঝুমুর বাড়ির পাশে আম কুড়াতে যায়। কিছুক্ষণ পর দুই বোনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে ঝুমুর থেকে যায়। সকাল ৮টার দিকে প্রতিবেশী এক নারী বাড়ির পাশের খালপাড়ে গাছের ডাল তুলতে গিয়ে ঝুমুরকে পানিতে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার দেন। এ সময় বাড়ির লোকজন গিয়ে অর্ধনগ্ন অবস্থায় ঝুমুরকে পানি থেকে তুলে নিয়ে আসেন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের খবর দেন। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও নারী সদস্য এসে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে জেলা পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ও মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠান।

এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল হানিফ মামলা করেন। মামলার পর ঘটনায় জড়িত বাহার উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে এ ঘটনার বিবরণ দেয় বাহার। পরে নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাসফিকুল হকের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বাহার। গ্রেফতারকৃত বাহার উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের কবুতরের বাড়ির আজিজুল হকের ছেলে।
কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভিযান চালিয়ে ধর্ষক ও খুনি বাহারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিশু ঝুমুরকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে সে। আদালতে ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বাহার। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মিজানুর রহমান/এএম/জেআইএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ দেশের জন্য আবু সাঈদের মতো বুক পেতে দিতে রাজি আছি: জামায়াত আমির
- ২ ফরিদপুরে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
- ৩ ভোট চাইতে গেলেই এ্যানিকে পান-সুপারি-পিঠা নিয়ে বরণ করছেন ভোটাররা
- ৪ কুমিল্লায় বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেফতার আইনজীবী কারাগারে
- ৫ সৎ-যোগ্য নেতাকে ভোট দিতে বলায় খতিবকে মারতে গেলেন মুসল্লিরা