ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

‘ভয় উপেক্ষা করে বাংলাদেশের পতাকা টানিয়েছিলাম’

জেলা প্রতিনিধি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া | প্রকাশিত: ১১:১২ এএম, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

‘চারদিকে শুধু শেখ মুজিব-শেখ মুজিব ধ্বনি। আমাদের একজনই নেতা, তিনি শেখ মুজিব। ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার পর আমাদের মুক্তির নেশা পেয়ে বসে। ভয়কে উপেক্ষা করে ২৩ মার্চ রাতে পিলখানার প্যারেড গ্রাউন্ডের বটগাছে আমরা সাতজন মিলে টানিয়েছিলাম বাংলাদেশের পাতকা।’

কথাগুলো বলছিলেন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্’র (ইপিআর) নায়েক মো. রেজাউল হক। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

সম্প্রতি রণাঙ্গনের এই যোদ্ধার মুখোমুখি হন জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক। রেজাউল হক জানান, জীবনের শেষ বেলায় আর কোনো চাওয়া নেই তার। কারণ কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশ মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি। এরপরও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মান দিয়েছে সেটা অনেক বেশি বলে মনে করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানী।

১৯৪০ সালের ১০ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের ঘাটিয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রেজাউল হক। তার বাবা নজিরুল হক ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল। আর মা আছিয়া বেগম গৃহিণী। তিনি এখনও জীবিত আছেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রেজাউল হক সবার বড়। ১৯৬৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ (ইপিআর)-এ যোগ দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ রাইফেলস্ (বিডিআর) থেকে সুবেদার মেজর হয়ে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক বলন, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমি ও ইপিআর-এ কর্মরত আমার দুই বন্ধু আবুল হোসেন এবং আকরাম গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। ভাষণ শোনার পর থেকেই আমরা মুক্তিকামী হয়ে উঠেছিলাম। পিলখানায় কর্মরত আমরা বাঙালিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু বাঙালিরা একে অপরের সঙ্গে বাংলায় কথা বললে পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করত। ২৩ মার্চ রাতে আমরা সাতজন একত্রিত হয়ে পিলখানার প্যারেড গ্রাউন্ডের বটগাছে বাংলাদেশের পতাকা টানাই। পরদিন ২৪ মার্চ সকাল ৯টার দিকে পাকিস্তানিরা ওই পতাকা দেখার পর গাছ থেকে নামিয়ে আমাদের ইন্টেলিজেন্স অফিসে নিয়ে রাখে। তখন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে থাকে কার এতো বড় স্পর্ধা? কে এই পতাকা টানিয়েছে? যদি জানতে পারত আমরা এই কাজ করেছি তাহলে সেখানইে আমাদের গুলি করে মারত।

এরপর ২৫ মার্চ রাত ১২টা ৫ মিনিটে পাক বাহিনী পিলখানায় বাঙালিদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে। প্রথমে পিস্তলের ফায়ার, তারপর শুরু করে ব্রাশ ফায়ার। আমি জানতাম ধরা পড়লে আমাকে কষ্ট দিয়ে মারবে। তাই ওইদিন রাতেই আমি জীবন বাজি রেখে আমাদের ইন্টেলিজেন্স অফিসের পেছন দিকে টয়লেট দিয়ে পিলখানা ত্যাগ করি। পুরো ঢাকায় তখন গোলাগুলি চলছে। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে পিলখানায় অনেকেই মারা যায়। তিনদিন পর ২৮ মার্চ রাতে পায়ে হেঁটে আমার গ্রামের বাড়ি ঘাটিয়ারার উদ্দেশ্যে রওনা হই আমি। রাস্তায় শুধু মানুষের লাশ আর লাশ। হাঁটতে-হাঁটতে আমি ডেমরা পর্যন্ত আসি। এরপর সেখান থেকে নৌকায় করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ ঘাটে আসি। নৌকার ভাড়া দুই টাকা চেয়েছিল। কিন্তু আমি ইপিআর’র লোক বলার পর আমার কাছ থেকে টাকা নেয়নি।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিলখানায় পাক বাহিনীর হামলার কথা শুনে আমার পরিবার ও গ্রামের লোকজন মনে করেছিল আমি মরে গেছি। ২৯ মার্চ আমি বাড়িতে যাওয়ার পর গ্রামের সবাই আমাকে দেখতে আসে। এরপর আমি গ্রামের কিছু ছেলেদের সংগঠিত করলাম মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য। এর মধ্যে খবর পাই শীতকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৎকালিীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ফোর বেঙ্গলের ডি কোম্পানির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন এম. আইন উদ্দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছেন। আমি ও আমার ভাই সাইদুল হক এবং আমার চাচা আব্দুল কাদের ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিনের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে আমাদের রাখার জন্য বলি। আমি ইপিআর’র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্য হওয়ায় আমাকে তিনি স্বাগত জানালেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে আমরা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকতে পারলাম না।

Freedom-Fighter-Rezaul-Hoque

ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিনের মাধ্যমে আমরা ৭০/৮০ জন ১৭ এপ্রিল চলে যাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরের চারিপাড়ায়। সেখানে আমাদের নিয়ে একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। এরপর আমারা কে কোন এলাকায় যুদ্ধ করব সেটি নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আমরা ২নং সেক্টরের অধীনে থাকা মনতলী সাব সেক্টরে যোগ দেই। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। আর ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন ছিলেন মনতলী সাব সেক্টরের কমান্ডার। আমরা যেহেতু ইপিআর’র প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলাম তাই যুদ্ধের জন্য আর নতুন করে প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রয়োজন হয়নি।

আমাকে তখন সিকিউরিটি বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমার কাজ ছিল পাক বাহিনীর ক্যাম্পের সকল খবরা-খবর সংগ্রহ করে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা এবং কোন জায়গা থেকে ফায়ার করা যাবে- সেটির ছক বানিয়ে দেখানো। এরপর আবার পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। কোনো এলাকায় পাক বাহিনীর সকল তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমাকে তিন-চারদিন থাকতে হতো। আমার সঙ্গে এই কাজে সহযোগিতা করত আরও কয়েকজন।

মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক আরও বলেন, আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার কিছু অংশ এবং কসবাসহ ২নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় যুদ্ধ করেছি। পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য কয়েকটি সেতুও ধ্বংস করেছিলাম আমরা। এপ্রিল মাস থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় অনেক অপারেশন চালিয়েছি। অনেক পাক সৈন্য মেরেছি। এর মধ্যে আমাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হয়েছেন। যুদ্ধে আমার ভাই সাইদুল হক তার পা হারিয়েছেন। ৬ ডিসেম্বর ভোরে আমরা আখাউড়ার গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশনের পাশে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করি। ওই অপারেশনে একসঙ্গে ৩৫ জন পাক সৈন্যকে হত্যা করেছিলাম আমরা। আমাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও সেদিন শহীদ হন।

রেজাউল হকের সহযোদ্ধা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার লাউর ফতেহপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. আবু জাহের বলেন, আমরা সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ করেছি আখাউড়া ও কসবার বিভিন্ন এলাকায়। ৬ ডিসেম্বরই আমারা সবচেয়ে বড় অপারেশন চালাই আখাউড়ার গঙ্গাসাগরে। ওইদিন ভোর ৪টার দিকে বর্তমান গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশনে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করি।

তিনি আরও বলেন, পাক সেনারা সেখানে বাংকার বানিয়ে অবস্থান করছিল। তাদেরকে নিস্তেজ করতে আমারা গ্রেনেড ও রকেট লাঞ্চারসহ সব ধরণের অস্ত্রের ব্যবহার করেছিলাম। ওই অপারেশনে ৩৫ জন পাক সৈন্যকে আমরা মারতে পেরেছিলাম। আমাদের সঙ্গে ওই অপারেশনে ভারতীয় মিত্র বাহিনীও অংশ নেয়। পরে সেখান থেকে আমরা ছয়জন পাক সৈন্য এবং তাদের সহযোগী তিনজন বাঙালিকে জীবিত আটক করে তাদের আগরতলা ক্যাম্পে নিয়ে যাই। এরপর সেখান থেকে ৯ ডিসেম্বর আমরা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট দখলে নেয়ার জন্য ক্যাম্প থেকে বের হই। কিন্তু তখন আমরা ক্যান্টনমেন্ট দখলে নিতে পারিনি। পরবর্তীতে ১৭ ডিসেম্বর পাক সেনারা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমএস