ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ছোট ভাইকে আসামি সাজিয়ে জামিন নিয়ে সপরিবারে উধাও

জেলা প্রতিনিধি | কক্সবাজার | প্রকাশিত: ১০:১৯ এএম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯

১২ বছর বয়সী ছোট ভাইকে আসামি সাজিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে হাইকোর্ট থেকে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়ে উধাও হয়েছেন মানবপাচার মামলায় অভিযুক্ত কক্সবাজারের রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের ২২ বছরের যুবক আলাউদ্দিন। আলাউদ্দিনের পরিবর্তে সেসময় আদালতে আত্মসমর্পণ করানো হয়েছিল ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকে। রফিকুল কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া এতিমখানায় থাকতো। সে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

রোববার (২২ ডিসেম্বর) শেষ হচ্ছে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিনের মেয়াদ। আগামীকাল সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিতে হবে আলাউদ্দিনকে। কিন্তু এদিন কে হাজির হচ্ছেন সেটাই দেখার বিষয়।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নিযাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে আলাউদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা করেন চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলার উজানটিয়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। আর আসামি আলাউদ্দিনের বাড়ি রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের চমুদারপাড়া পাড়ায়।

বিচারিক আদালত ৬ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি দ্বৈতবেঞ্চে আলাউদ্দিনের বদলে তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকে দাঁড় করানো হয়। আদালত ১২ বছর বয়সী শিশু রফিককে আলাউদ্দিন মনে করে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন দেন।

ওইদিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘মানবপাচার মামলায় জামিন পেল ১২ বছরের শিশু আলাউদ্দিন’ শিরোনামে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হলে রামুতে তোলপাড় শুরু হয়। প্রকাশিত সংবাদে আলাউদ্দিনের জায়গায় ছোট ভাই রফিকুল ইসলামের ছবি দেখে হতবাক হয় লোকজন। এরপর আলাউদ্দিন মা রিজিয়া বেগম ও ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হন। পুলিশ তাদের হন্য হয়ে খুঁজছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৪ সালের ২০ জুন আসামিরা মালয়েশিয়ায় ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে নুরুল ইসলাম (মামলার বাদী) ও একই এলাকার হেলাল উদ্দিনকে লোহাগড়া থেকে কক্সবাজারের দরিয়ানগর উপকুলে নিয়ে আসেন। পরের দিন (২১ জুন) রাতে আরও ২০-২৫ জনের সঙ্গে তাদের দুইজনকেও একটি ট্রলারে তুলে গভীর সাগরে অপেক্ষমান একটি জাহাজে ওঠানো হয়। কয়েকদিন পর জাহাজটি থাইল্যান্ড উপকূলে পৌঁছে তাদের জঙ্গলে নামিয়ে দেয়। সেখানে দালালরা তাদের বেদম মারপিট শুরু করে এবং বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুই লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবী করে। অন্যথায় হত্যা করে তাদের মরদেহ গুম করার হুমকি দেয়।

পরিবারের সদস্যরা কোনো উপায় না দেখে বাড়ির গাছ, গবাদিপশু ও জমি বিক্রি করে দুই লাখ টাকা করে চার লাখ টাকা তুলে দেন দালালদের (মামলার আসামিদের) হাতে। এরপর থাইল্যান্ডের দালালরা দুইজনকে মালয়েশিয়ার দালালের কাছে পৌঁছে দেয়। মালয়েশিয়ার দালালরা তাদের পুনরায় চেরাংবান শহরের একটি কারখানায় আটকে রাখে এবং বিনামূল্যে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য করে।

২০১৭ সালের জুন মালয়েশিয়া পুলিশ অবৈধ অভিবাসী হিসাবে দুইজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে। দীর্ঘ ১ বছর কারাভোগের পর দুইজনকে আনা হয় সেখানকার অভিবাসী ক্যাম্পে। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের১৯ জুলাই হেলাল উদ্দিন ও ২৭ সেপ্টেম্বর নুরুল ইসলামকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনে। এরপর ২৯ অক্টোবর ছয় আসামিদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা করেন নুরুল ইসলাম।

বাদিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জি এম জাহিদ হোসেন বলেন, মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে হাইকোর্টকে বোকা বানিয়ে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়েছিলেন আলাউদ্দিন। ২২ ডিসেম্বর শেষ হবে আগাম জামিনের মেয়াদ। ২৩ ডিসেম্বর আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে আদালতে কে আসবেন- প্রকৃত আলাউদ্দিন নাকি হাইকোর্টে প্রক্সি দেয়া ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম? আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি।

এদিকে শনিবার (২১ ডিসেম্বর) দুপুরে আলাউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির পাশের বাইতুস সালাম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ঈমাম হাবিব উল্লাহ বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে আগাম জামিনে আসার প্রতারণা ফাঁস হওয়ায় আলাউদ্দিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।

আলাউদ্দিনের চাচাতো ভাবি ইসমাত আরা বলেন, আলাউদ্দিন মানবপাচার মামলার আসামি হওয়ার পর ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকে আলাউদ্দিন পরিচয়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায়। আমরা পত্রপত্রিকা এবং টেলিভিশনে বিষয়টি দেখে অবাক হয়েছি। কারণ, রফিকুল ইসলাম কী করে আলাউদ্দিন হলো? পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে আলাউদ্দিন তার মা রিজিয়া বেগমসহ ভাইবোনদের নিয়ে দুই মাস ধরে নিখোঁজ। তারা নিজেদের ঘর ভেঙে ভিটেটাও স্থানীয় আবুল হোসেনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আলাউদ্দিন, তার বড় ভাই মঈন উদ্দিন ও মা রিজিয়া বেগম জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন।

আবুল হোসেনের মা আছিয়া খাতুন জানান, ওই জমিটি (১৫ করা) তারা তিন লাখ টাকায় কিনেছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শফিউল্লাহ জানান, আলাউদ্দিনের স্থলে রফিকুল ইসলামকে দেখিয়ে উচ্চ আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি চরম প্রতারণা ও দুঃখজনক।

আইনজীবী জি এম জাহিদ বলেন, শিশু রফিকুল ইসলাম কক্সবাজার বায়তুশ শরফ এতিমখানার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তার বর্তমান বয়স ১২ বছর। আর মামলার আসামি আলাউদ্দিনের বয়স ২২ বছর।

শনিবার বিকেলে বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া এতিমখানায় গিয়ে শিশু রফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। এতিমখানার পরিচালক মাওলানা শফি জানান, অসুস্থতার অজুহাতে দুই মাস আগে ছুটি নিয়ে সে বাড়ি চলে গেছে। গতকাল (শনিবার) পর্যন্ত সে আর এতিমখানায় ফিরে আসেনি।

রামু থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানান, গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর অভিযুক্ত আলাউদ্দিনসহ তার পরিবারের লোকজনকে খুঁজছে পুলিশ।

সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/পিআর