ধান ক্রয়ের লটারিতে ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্ত্রী-সন্তানের নাম
লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না কুড়িগ্রামে। লটারি না করেই ইউপি চেয়ারম্যান, তার স্ত্রী-সন্তান, স্বজনসহ ১১ ইউপি সদস্য এবং জেলা খাদ্য গুদামের কর্মচারীর নাম অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ধান ক্রয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে কৃষি কার্ড ক্রয় করে একটি সিন্ডিকেট ধান বিক্রি করছে খাদ্য গুদামে। ফলে প্রকৃত কৃষক সরকারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নে উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচিত করে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের নিয়ম থাকলেও সেটা মানা হয়নি। এখানে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকায়- ১১৭ নম্বরে ইউপি চেয়াম্যান উমর ফারুখ, ১৩৯ নম্বরে স্ত্রী স্মৃতি ফারুক, ৭০ নম্বরে ছেলে রাজ্জাক রাজু ও ১০১ নম্বরে রেজাউল করিম, ৯০ নম্বরে ভাই হাছেন আলী এবং পরিষদের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্যসহ ১১ জনের নাম রয়েছে।
এছাড়াও শাহাজাদা চৌধুরী জেলা খাদ্য গুদামে চাকরি করার সুবাদে নিজের ও তার স্বজনের নামও তালিকায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে ভিটেমাটি ছাড়া ফসলি জমি না থাকলেও ধান ক্রয়ের কৃষক তালিকায় নাম আছে অনেকের। প্রচার-প্রচারণাসহ জনসম্মুখে লটারি করার নিয়ম থাকলেও সেটা না করেই কৃষক নির্বাচনের তালিকা প্রকাশ করেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়। ইউনিয়নের অনেক নামধারী কৃষকদের কৃষি কার্ড অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে সরকারি গুদাম ঘরে ধান বিক্রি করে আসছে একটি সিন্ডিকেট। প্রকৃত কৃষকদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কৃষকদের কাছে থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। চলতি মৌসুমে সদর উপজেলায় ১ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করবে খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিভাগ। সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে কৃষি কার্ডধারী কৃষক রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার। এর মধ্যে পৌরসভায় ২ হাজার ৮৫১ জন, হলোখানায় ৩ হাজার ৭২১ জন, কাঁঠালবাড়ীতে ২ হাজার ৭৪৬ জন, বেলগাছায় ২ হাজার ২৪৯ জন, মোগলবাসায় ৪ হাজার ৬৪৯ জন, যাত্রাপুরে ২ হাজার ৪৭৮ জন, পাঁগাছীতে ২ হাজার ৭৬৬ জন, ঘোগাদহে ৪ হাজার ৬৭৩ জন, ভোগডাঙ্গায় ৬ হাজার ৯৯ জন কৃষক রয়েছে। রোপা-আমন ধান উৎপাদনকারী হিসেবে তিন ক্যাটাগরিতে বড়, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র প্রান্তিক ৩২ হাজার ২৩২ জন কৃষকের তালিকা দিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
হলোখানা ইউনিয়নের সন্ন্যাসী গ্রামের (কৃষি কার্ড নং- ১২৪২) কৃষক ফজর বলেন, আমার বাড়িভিটে ১২ শতক। আমার কৃষি কার্ড রয়েছে। সেই কার্ড খাদ্য বিভাগে কর্মরত শাহাজাদা ৫শ টাকায় নিয়েছে। গতবারও আমার নাম তালিকায় ছিল। সেবারও ৫শ টাকা দিয়ে কার্ড নেয় শাহাজাদা। ১৫ মণ ধান দিয়েছি, এতে করে শাহাজাদা আমায় ১৬শ টাকা দিয়েছে। এবার কত মণ ধান দিবো আর কত টাকা দিবে সেটা আলাপ হয়নি।
একই এলাকার (কৃষি কার্ড নং-১৪৩৪) নুর আলমের স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, তালিকায় হামারও নাম উঠেছে। কৃষি কার্ডটা শুনছি ৫শ টাকায় শাহাজাদার কাছে দিছে আমার স্বামী। গতবারও পাইছিল।
এবার ধান আবাদ না করলেও তালিকায় কীভাবে নাম এলো প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার স্বামীর সঙ্গে শাহাজাদার কী আলাপ হইছে জানি না। জমিজমা সম্পর্কে বলেন, ১১ শতক ভিটেবাড়ি রয়েছে। সেটাও ভাগাভাগি হয়েছে।
কৃষি কার্ড নং-১৩৮০, এবারের তালিকায় ১৩৬ নম্বরে থাকা আনছার আলীরও আবাদি জমি নেই বলে জানা যায়। মদাজালফারা গ্রামের (কৃষি কার্ড নং-১৩৩৯) আশরাফুল হক পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। আশরাফুলের স্ত্রী বলেন, তালিকায় নাম আছে। লিব্লু ৫শ টাকা দিয়ে কার্ড নিয়ে গেছে। ধান কেনা শেষ হইলে আরও টাকা দিবে। ভিটেবাড়ি ছাড়া নিজস্ব কোনো আবাদি জমি নেই।
ওই ইউনিয়নের কৃষক হজুর আলী এবং আব্দুল কুদ্দুছসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়ের তালিকা প্রস্তুত করা হলেও আমরা তা জানতে পারিনি। এলাকায় কোনো ধরনের প্রচারণা না করেই লটারির নামে আসল কৃষকদের বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান ও খাদ্য বিভাগের অফিসাররা মিলে করে কৌশলে তাদের পছন্দের লোকজনের নাম তালিকায় দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক জোবেদ আলী, ছাত্তার, বাদশা জানান, সাধারণ কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান দিতে পারে না। ধান নিয়ে গেলে ১৫/২০দিন পর্যন্ত গুদামের বাইরে রাখতে হয়। ধানে চিটাসহ অনেক কিছুর ভুল ধরে অফিসাররা। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ৫০০-১০০০ টাকা ঘুষ দিলে সব কিছুই ঠিক হয়ে যায়। না দিলে ফেরত আসতে হয়। খাদ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের হয়রানি কারণে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালের কাছে কৃষি কার্ড বিক্রি করেন।
অভিযুক্ত শাহাজাদা চৌধুরী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তালিকায় কীভাবে আমার ও আমার চাচার নাম এসেছে আমি জানি না। তালিকা প্রকাশের পর জানতে পেরেছি।
কৃষি কার্ড কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে কেনা হয় না। গ্রামের মানুষজন উপকারের জন্য আসে তাই উপকার করি।
অপর অভিযুক্ত আব্দুর গফুর লিব্লু বলেন, আমাকে কেউ কোনো কার্ড দেয়নি। আমি এগুলোর ব্যবসা করি না, কারও কার্ড নেইনি।
তালিকায় নিজের নাম ওঠার বিষয়ে তিনি বলেন, অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেই হয়েছে।
অভিযোগকারী ইউপি সদস্য খাইরুল ইসলাম জানান, ইউনিয়নে একমাত্র আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ইউপি সদস্য হওয়ায় ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকায় তালিকা থেকে আমাকে বাদ দিয়েছে। খাদ্য অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজশে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে পছন্দের লোকজনকে তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। এমন দুর্নীতি দেখে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি বলে তিনি জানান।
হলোখানা ইউপি চেয়ারম্যান উমর ফারুখ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো কৃষি কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপান। তিনি বলেন, কীভাবে কী হয়েছে আমি বলতে পারি না। কৃষি অফিসাররা যখন তালিকা করেছেন তখন কারও সঙ্গেই পরামর্শ করেননি।
এই বিষয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন খাদ্য বিভাগের ওপর দোষ চাপালেন। শুধু মাত্র তালিকা দিয়েই কৃষি বিভাগের কাজ শেষ বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নীতিমালার কারণে এমন অনিয়ম হয়েছে।
হলোখানা ইউনিয়নের নির্বাচিত কৃষক তালিকা নিয়ে লিখিত অভিযোগের কথা স্বীকার করে সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়া হবে।
নাজমুল হোসাইন/আরএআর/এমএস