ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না বদি-এমপি শাহিনসহ অনেক জনপ্রতিনিধি

সায়ীদ আলমগীর | প্রকাশিত: ০৯:২৩ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

অবশেষে দ্বিতীয় দফায় ২১ ইয়াবা কারবারি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফ সরকারি ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক ফুল দিয়ে স্বাগত জানিয়ে তাদের আইনের আওতায় নেন।

পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জেলা-উপজেলা কর্মকর্তা, স্থানীয় ধর্মীয় নেতা ও সুধীজন উপস্থিত থাকলেও সরকারদলীয় স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন।

অনুপস্থিত ছিলেন নিকট অতীতেও সীমান্ত উপজেলায় ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগ সভাপতি নুরুল আলমসহ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সিংহভাগ জনপ্রতিনিধি।

yaba

এসব বিষয় অনুষ্ঠানে আসা লোকজনের মাঝে নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি করে। কী কারণে তারা অনুপস্থিত, অনেকে তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণও শুরু করেন। অনেক জনপ্রতিনিধি নিজে এবং অনেকের স্বজনের নামে ইয়াবা সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় এলাকার জনহিতৈষী আয়োজন থেকে এসব জনপ্রতিনিধি বাদ পড়ছেন নাকি অন্য কোনো কারণে নিজেদের আড়ালে রেখেছেন, তার হিসাব মেলাতে চেষ্টা চালান তারা।

অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমবার আত্মসমর্পণে সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির কয়েকজন নিকটাত্মীয়ও ছিলেন। এদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি চার্জশিটও দাখিল করেছে পুলিশ। তাছাড়া শুরু থেকেই গডফাদার হিসেবে বদির নাম এক নম্বরে এসেছে বারবার। এসব কারণে গতবার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপি হিসেবে বদির উপস্থিতি নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। তাই এবার হয়তো বিতর্কমুক্তভাবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান শেষ করতে বদিসহ তার স্ত্রী বর্তমান এমিপ শাহিন আরা বদিও বাদ পড়েছেন। একই অভিযোগ রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আলমসহ পরিচিত অন্যান্য আরও সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি।

তবে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমরা সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। তারা কেন উপস্থিত হননি তা সঠিক বলা যাচ্ছে না।

yaba

গতবার এলেও এবার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে না আসার কারণ সম্পর্কে জানতে সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু ফোন রিসিভ না হওয়ায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। একইভাবে ফোনে সংযোগ না পাওয়ায় অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতির বক্তব্য জানা যায়নি বদির স্ত্রী ও বর্তমান এমপি শাহিন আরা বদির।

বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগ সভাপতি নুরুল আলমের সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে কোনো উত্তর না দিয়ে চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, ‘কিছু লোকজনের সঙ্গে বৈঠকে আছি, আমি আপনাকে (প্রতিবেদককে) পরে ফোন দেব’ এটি বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। কিন্তু এরপর আর ফোন দেননি এবং রিসিভও করেননি।

তাদের অনুপস্থিতি সম্পর্কে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘মাদক-জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি’ এ তিনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সেই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে পুলিশ। সীমান্তে ইয়াবার আগ্রাসন রোধই আমাদের ধ্যান-জ্ঞান। আমরা অভিযানের পাশাপাশি কারবারিদের অপকর্ম ছাড়িয়ে স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতের চেষ্টাও চালাচ্ছি। প্রথম আত্মসমর্পণে ইয়াবায় অভিযুক্ত অনেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সে থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিতর্কিতদের এড়িয়ে আত্মসমর্পণ কলুষমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে সাধারণ মানুষের অভিমত, শীর্ষ গডফাদারদের আত্মসমর্পণের আওতায় আনা হলে টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা আসা বন্ধ হতো। আড়ালে-আবডালে ঘাপটি মেরে থাকা গডফাদাররাই সীমান্তে টিকে থাকা ইয়াবা পাচারকারীদের সাহসের খোরাক জোগাচ্ছে হয়তো।

yaba

পুলিশ সূত্র জানায়, টেকনাফে ইয়াবা কারবারিদের প্রথম আত্মসমর্পণ হয়েছিল ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর উপস্থিতিতে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সেখানে সাবেক এমপি বদির চার ভাইসহ ঘনিষ্ট ১৬ আত্মীয় ছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলেন সাতজন। এছাড়া ছিলেন বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীও।

কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা তালিকায় কক্সবাজারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আছেন ৭৩ জন। তাদের মাঝে প্রথম দফায় আত্মসমর্পণ করেছেন মাত্র ২৪ জন। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা টেকনাফ শিলবুনিয়া পাড়ার সাইফুল করিম ওরফে হাজি সাইফুল গত বছর পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। বেশ কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলেও ওই তালিকার বেশির ভাগই আত্মসমর্পণ না করে এখনও গা-ঢাকা দিয়ে আছেন।

yaba

আর গতকাল (৩ ফেব্রুয়ারি) দ্বিতীয় দফায় ২১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেন। তারা ২১ হাজার ইয়াবা, ১০টি এলজি ও ৩০টি তাজা কার্তুজ জমা দিয়েছেন। প্রথমবার ১০২ জন ইয়াবা কারবারির কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিল তিন লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ও ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের সবার বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে টেকনাফ থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এদের মাঝে একজন কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন আর বাকি ১০১ জনের বিরুদ্ধে গত ২০ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। সোমবার আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধেও দুটি পৃথক মামলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৪ মে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কক্সবাজারে নিহত হন ২১১ জন। তাদের মধ্যে দুই নারীসহ ৬২ জন রোহিঙ্গা। জব্দ করা হয় এক কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৭০ পিস ইয়াবাও। আটক হন দুই হাজার ৩৩৮ জন। এসব ঘটনা মাদককারবারিদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেক চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি গা-ঢাকা দিলেও চুনোপুটি অনেকে আত্মসমর্পণ করতে মরিয়া হয়ে ছুটেছেন।

সায়ীদ আলমগীর/বিএ/জেআইএম