ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

গরিবের ডাক্তারের মৃত্যুতে হতাশ খেটে খাওয়া মানুষগুলো

জেলা প্রতিনিধি | টাঙ্গাইল | প্রকাশিত: ০৯:১০ পিএম, ২৭ জুন ২০২০

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ কথাটি এখন অনেকটাই কাল্পনিক বলে মনে হয়। মূল্যবান এ কথাটির যথার্থতা এখন টাঙ্গাইলের নাগরপুরের গরিবের ডাক্তারখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. চিত্তরঞ্জন দাসের জীবন আদর্শ।

প্রায় চার যুগ ধরে উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে এসেছেন তিনি। গরিব-অসহায় মানুষকে বিনা টাকায় চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি।

উপজেলার ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। এ কারণে এলাকার মানুষ তাকে গরিবের ডাক্তার হিসেবে সম্বোন্ধন করতেন।

এলাকার মানুষের কাছে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন গরিবের ডাক্তার খ্যাত এই সিআর দাস এর কারণে এলাকায় আসা কোনো এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যেত না রোগীরা। এতে এলাকায় এমবিবিএস কোনো ডাক্তার চেম্বার খুললেও রোগী না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় সেই চেম্বার। ফলে পাস করা কোনো ডাক্তার না হয়েও আজ তিনি মানুষের স্বীকৃত গরিবের ডাক্তার।

তার মৃত্যুতে চরম বিপাকে এখন এলাকার গরিব আর খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের দাবি, গরিবের ডাক্তারের (সিআর দাসের) স্মৃতি রক্ষার্থে ও তার নামে নির্মিত হোক একটি স্মৃতিস্তম্ভ।

জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. চিত্তরঞ্জন দাস উপজেলার সলিমাবাদ ইউনিয়নের ঘুনিপাড়া গ্রামের প্রয়াত মতিলাল দাসের ছেলে।

১৯৫৪ সালে এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে এসএসসি পাস করে ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাদেরিয়া বাহিনীর একজন যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর সরকারি বন বিভাগে ফরেস্টার হিসেবে যোগদান করেন। সেই চাকরি ছেড়ে চলে যান ঢাকায় মামা বাড়িতে। সেখান থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যক্ষ্মা বিভাগে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার গ্রামের বাড়ি ফিরে আসেন তিনি।

তৎকালীন সময়ে সলিমাবাদে একমাত্র ডাক্তার ছিলেন তার নানা দাদু লাল বিহারী দাস। সেই সুবাদে নানা লাল বিহারি দাসের কাছ থেকে হাতেখড়ি হিসেবে গ্রহণ করেন প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ। এরপর ১৯৭৩ সালে উপজেলার তেবারিয়া জনতা কলেজ থেকে এইচএসসি ও পরে নাগরপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন তিনি।

চলতি বছরের ২০ জুন হঠাৎ বুক ব্যথা দেখা দিলে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। পরে গ্রামেই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাহ করা হয়।

গ্রামের রহিম, কুদ্দুছ, মজিরনসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, গ্রামের বেশির ভাগ মানুষকেই চিকিৎসা দিয়েছেন ডা. চিত্তরঞ্জন দাস। বিনা পয়সায় তার চিকিৎসা পেয়েছে গ্রামের গরিব আর অসহায় মানুষ। এখন তিনি না থাকায় তার অভাবটা ভীষণভাবে উপলব্ধি করছি। তাই আমরা তার স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

তেবাড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর-রশিদ বলেন, মৃত্যুর আগ অবধি প্রায় চার যুগ ধরে তেবাড়িয়া গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। উপজেলার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। গরিব-অসহায় মানুষকে বিনা টাকায় চিকিৎসা দিতেন তিনি। এজন্য এলাকার মানুষ তাকে গরিবের ডাক্তার নামেই ডাকতো। তার চিকিৎসা পদ্ধতি মানুষের কাছে এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে এলাকায় কোনো এমবিবিএস ডাক্তার এসে চেম্বার খুললেও সেটি ধরে রাখতে পারেননি। গ্রামের রোগীরা পল্লী চিকিৎসক সি আর ডাক্তারকে বাদ দিয়ে ওই এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যেত না বলেই অবশেষে চেম্বার বন্ধ করতে হয় তাদের।

সলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ড সদস্য মনোরঞ্জন দাস বলেন, মৃত্যুর আগ অবধি গ্রামের অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। অনেক ভালো মানুষ ছিলেন ডা. চিত্তরঞ্জন দাস। তার স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের যে দাবি তুলেছেন গ্রামবাসী সেটি বাস্তবায়নে পরিষদে উপস্থাপন করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

আরিফ উর রহমান টগর/এমএএস/এমকেএইচ