পদ্মার পানির তোড়ে ফরিদপুর শহররক্ষা বাঁধে ধস
গত ১২ ঘণ্টায় ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রোববার (১৯ জুলাই) ফরিদপুর শহররক্ষা বাঁধের সাদিপুর এলাকায় ৫০ মিটার ধসে যাওয়ায় শহরতলীর লোকালয়ে তীব্র বেগে ঢুকে পড়েছে পদ্মার পানি।
সাদিপুর এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ ধসে যাওয়ায় জেলা সদর থেকে চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় যাওয়ার সড়কটি ধসে গেছে। ওই এলাকা প্লাবিত হওয়ায় দুই উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ সময় পানির তোড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে ৫-৬টি বসতবাড়ি, উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছপালা। ওই সড়কের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়ায় আগেই বন্ধ করে দেয়া হয় সড়কে ভারি যান চলাচল।
এদিকে জেলার চরভদ্রাসন উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে বন্যা দুর্গত মানুষ। এসব মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, জেলা সদরসহ চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার এখন পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। তাদের জন্য ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে সরকারি খাদ্য সহায়তা বিতরণ। এছাড়া জেলা সদর থেকে চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় যাওয়ার প্রধান সড়কটির ৫০ মিটার ধসে গেছে। জরুরিভাবে চলাচলের উপযোগী করতে সড়ক বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জেলার চরভদ্রাসনে বন্যা দুর্গত মানুষ বসতবাড়ির মালামালসহ গরু-ছাগল নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির ফলে পদ্মা চরের চর ঝাউকান্দা ইউনিয়ন, চর হরিরামপুর ও গাজীরটেক ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক রাস্তা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা সদরের জনগুরুত্বপূর্ণ দুটি পাকা রাস্তা ও দুটি ইটের রাস্তা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া জেলা শহরে যাতায়াতের জন্য এমপি ডাঙ্গী গ্রাম থেকে জাকেরের সুরা ব্রিজ পর্যন্ত পাকা রাস্তায় বালুর বস্তা ফেলে পানির প্রবাহ রোধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন।
এদিকে উপজেলা সদরে বালিয়াডাঙ্গী ও ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ ধসের ফলে মেরামত কাজ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নে বন্যা দুর্গত ৫২০ পরিবারের মাঝে সরকারিভাবে সাড়ে ৫ মেট্রিক টন চাল ও ২৬০ কেজি ডাল বিতরণ করা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ইউনিয়নের বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হবে বলে উপজেলা ত্রাণ অফিস জানিয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, চরাঞ্চলের প্রায় সবগুলো বাড়ির চাল পর্যন্ত পানিতে নিমজ্জিত থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। এসব পরিবারের গরু ছাগল ও গৃহপালিত পশু চরাঞ্চলের প্লাবিত রাস্তায় পানির মধ্যে রাখা হয়েছে। ফলে বন্যাকবলিত এসব চরাঞ্চলে গত ক’দিন ধরে গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
উপজেলা চরহরিরামপুর ইউনিয়নের হাজারবিঘা নামক পদ্মাচরের হতদরিদ্র্র কৃষক মান্নান শেখ (৫৫) জানান, পদ্মা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব বিলীন হওয়ার পর পদ্মার বালু চরে কাশবন দিয়ে বসতি গড়ে বসবাস করে আসছি। এ বছর আগাম বন্যার ফলে ফসলি মাঠের বাদাম, তিল ও ধান ঘরে তুলতে পারিনি। আবার বসতঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় এখন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছি।
ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রিত এক গৃহিণী হায়াতুন্নেছা (৪২) জানান, পদ্মার চরে ছোনবনের কুড়ে ঘরে দিনমজুর স্বামীর সংসারে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছিলাম। এক সপ্তাহ আগে ঘরের উঠান ও দুয়োর পানিতে ভেসে গেল। একই দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ থাকার ঘরের মেঝে ভিজে কালো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে ঘরের ডওয়া চুইয়ে পানি আসতে শুরু করল। ওই রাতের মধ্যেই ঘরের মেঝেতে হাঁটু পরিমাণ পানি হলো। রাতে কয়েকবার প্রবল বৃষ্টিতে কাশবনের ছাওয়া ঘরের চাল চুইয়ে পানিতে কাঁথা-বালিশ সব ভিজতে লাগল। তাই পরের দিন এই স্কুলে উঠেছি। এখন স্কুল ভবন ছাড়া আশপাশের সব জায়গায় খালি পানি আর পানি।

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানা জানান, উপজেলার চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নের দুর্গতদের মাঝেও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ জানান, বর্তমানে পদ্মার পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। মধুমতি নদীর তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে।
ফরিদপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম নকিবুল বারী জানান, তীব্র স্রোতে জেলা সদর থেকে চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় যাওয়ার প্রধান সড়কটির ৫০ মিটার ধসে গেছে। জরুরিভাবে চলাচলের উপযোগী করতে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জেলার সদরপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৮ হাজার পরিবার। পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েকশ একর ফসলি জমি। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। নৌকায় চলাচল করছে মানুষ।
সদরপুর উপজেলার নির্বাহী অফিসার পূরবী গোলদার জানান, সরকারিভাবে ২৯ মেট্রিক টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এ উপজেলার প্রায় ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।
সিকদার সজল/এফএ/পিআর