জলবায়ু উদ্বাস্তুদের স্থায়ী ঠিকানা ‘শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্প’
কক্সবাজার উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের দেয়া কথা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া ও নাজিরারটেক এলাকার সাড়ে ৪ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে দেয়া হচ্ছে স্থায়ী আবাস। তাদের জন্য খুরুশকুলে অধিগ্রহণ করা ২৫৩ দশমিক ৩৫০ একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন। যা বিশ্বের অন্যতম বড় আশ্রয়ণকেন্দ্র হিসেবে রূপ পাচ্ছে।
শুধু স্থায়ী আবাস নয়, এখানে আসা পরিবারগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা আনতেও কর্মসূচি নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া ২০টি ভবনে ৬০০ পরিবারের মাঝে ফ্ল্যাট হস্তান্তর প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করেন।
ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত সমৃদ্ধ পর্যটন শহর। সৈকতের তীর রক্ষায় জাতির পিতা বালিয়াড়িতে ঝাউবন করেছিলেন। এখন সময় কক্সবাজারকে বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম স্থানে রূপান্তর করা। সে লক্ষ্যেই কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নত করা হচ্ছে। তা সম্প্রসারণে দরকার পড়া জমিতে বসবাস করা জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য খুরুশকুলে বিশাল আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। যা থেকে প্রাথমিকভাবে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া ২০টি ভবনের ফ্ল্যাট হস্তান্তর শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুল, স্বাস্থ্য সেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, বিনোদনের জন্য পার্ক এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আশ্রয় পাওয়া মৎস্যজীবীদের কর্মসংস্থানের জন্য স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক নগরায়ন পরিকল্পনায় নির্মিত হবে একটি শুঁটকি পল্লী। অশ্রয়ণ প্রকল্পটিকে মূল শহরের সঙ্গে সংযোগের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের মাধ্যমে ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যা পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। গড়ে তোলা হচ্ছে খেলার মাঠ, পুকুর, নলকূপ। দুর্যোগ থেকে রক্ষায় সবুজায়ন করা হবে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকা। অধিবাসীদেরও সে লক্ষ্যেই নিজেদের আত্মনিয়োগ করতে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধন শেষে বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে উপকারভোগীকে ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তর করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরোয়ার কমল, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফাসহ অন্যরা।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে গাছ রোপণ করেন উপকারভোগীরা। পরে কুতুবদিয়ার জলবায়ু উদ্বাস্তু প্রতিবন্ধী ইউছুফ নবী, জোবায়দা বেগম, সনাতন ধর্মালম্বী অঞ্জন দাশের কথা শোনেন প্রধানমন্ত্রী। তারা ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসে স্বজন হারানোর স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে যান। তারা স্থায়ী আশ্রয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।
পরে প্রকল্পের চলমান কাজ নিয়ে কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমান।
বক্তব্য শেষে স্থানীয় আঞ্চলিক শিল্পী বুলবুল আকতারের পরিবেশনায় ‘যদি সুন্দর এক্কান মুখ পায়তাম, মহেশখাইল্লা পানের খিলি তারে বনায় হাবাইতাম’ গানটি শুনেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের সঞ্চালনায় সর্বশেষ বক্তব্য দেন রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. মাইন উল্লাহ চৌধুরী। তিনি প্রকল্পের আদ্যপান্ত তুলে ধরেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ফ্ল্যাট হস্তান্তর প্রক্রিয়ার উদ্বোধনের মাধ্যমে উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো। ২০২৩ সালের মধ্যে বাকি ভবনগুলো সম্পন্ন হলে তালিকাভুক্ত সকল পরিবার এখানে এসে উঠবে।
তিনি আরও জানান, ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্বমানের পর্যটন বিকাশে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হচ্ছে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শহরের কুতুবদিয়া পাড়া, নাজিরাটেক এবং সমিতিপাড়া এলাকায় সরকারি খাস জমিতে বাস করা প্রায় সাড়ে চার হাজার পারিবারে বসতভিটা ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে চার হাজার ৪০৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন করতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পে সরকার খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর পূর্ব তীরঘেঁষা খুরুশকুলের প্রায় ২৫৩ দশমিক ৩৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। যা স্থানীয়ভাবে ‘শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নামে পরিচিতি পায়।
জেলা প্রশাসক জানান, এ প্রকল্পে ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন ছাড়াও ১০ তলা একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন হচ্ছে। ভবনটির নামকরণ হয়েছে ‘শেখ হাসিনা টাওয়ার’। এ পর্যন্ত পাঁচ তলা বিশিষ্ট ২০টি ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিটি ভবনে ৪৫৬ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে ৩২টি। কক্সবাজারের প্রসিদ্ধ পর্যটন স্পট, সামুদ্রিক মাছ, ফুল, নদীসহ নানা নামে সম্পন্ন হওয়া ২০টি ভবনের নামকরণও করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই।
তা হলো-দোঁলনচাপা, কেওড়া, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, গুলমোহর, গোলাপ, সোনালী, নীলাম্বরী, ঝিনুক, কোরাল, মুক্তা, প্রবাল, সোপান, মনখালী, শনখালী, বাঁকখালী, ইনানী ও সাম্পান। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২০টি বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। সকল সুবিধা নিশ্চিত করে তালিকাভুক্ত সকল পরিবারকে নিয়ে যাওয়া হবে আধুনিক এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে উপকূলীয় এলাকা থেকে কক্সবাজার শহরের বিমান বন্দরের আশপাশে যারা মানবেতর জীবনযাপন করছিল তাদের জন্যই মূলত প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার জানান, ২০১৮ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। বিমানবন্দর লাগোয়া কুতুবদিয়াপাড়া, নাজিরারটেক ও সমিতিপাড়ায় অধিগ্রহণ হওয়া জমি বিমানবন্দরে ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরের লাগোয়া আবাসনের ৬০০ পরিবারকে প্রাথমিক পর্যায়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে ২০টি ভবনের জন্য ৬০০ জনকে চিহ্নিত করা হয় গত ১৪ জুলাই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ফ্ল্যাট হস্তান্তর শুরু হয়েছে।
এদিকে, কক্সবাজার শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য বাঁকখালী নদীর ওপর তৈরি হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৯৫ মিটার দীর্ঘ সেতু ও সংযোগ সড়ক। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প একনেকে বিবেচনাধীন রয়েছে। এটা অনুমোদন হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে। এরপর অবশিষ্ট উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে।
সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/পিআর