ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

গরু নিয়ে বিপাকে বানভাসিরা

জেলা প্রতিনিধি | ফরিদপুর | প্রকাশিত: ১২:৫৭ পিএম, ২৫ জুলাই ২০২০

গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বন্যা কবলিতদের।

পাশাপাশি গো-খাদ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সময় কোরবানির পশুর জন্য অতিরিক্ত খাবার প্রয়োজন হয়। তবে অতিরিক্ত খাবার তো দূরের কথা ন্যূনতম খাবারও পাচ্ছে না কোরবানির পশু। খড়ের গাদা পানিতে ডুবে নষ্ট হচ্ছে। মাঠে আবাদি ঘাসও ডুবে গেছে। উঁচু জমিতে যে ঘাস ছিল অতি বৃষ্টির কারণে সেগুলোর গোড়া পচে গেছে। ফলে গো-খাদ্যের তীব্র সঙ্কটে কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যহানি ঘটছে। ঠিকমতো খাবার দিতে না পেরে গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চলের হাজারো পরিবার।

জেলা সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার চরাঞ্চলের হাজারো পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে গরু পালন ও কোরবানির ঈদে বিক্রি করে লাভবান হওয়া। কিন্তু এ বছর কোরবানির ঈদের আগে দেখা দিয়েছে বন্যা। এতে পদ্মার চরের প্রায় সব ফসলি মাঠ, গো-চারণ ভূমি, গো-খাদ্যের মাঠ প্লাবিত হয়েছে। খাদ্য সঙ্কটে গরুগুলোর ওজন কমে যাচ্ছে। এতে বড় অংকের লোকসান গুনতে হবে খামারিদের।

fpur-pic-03.jpg

এদিকে চরভদ্রাসন উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় গৃহস্থরা গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু রাস্তা ও বিভিন্ন স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। চরাঞ্চলের প্লাবিত রাস্তা ঘাট ও আশ্রয়কেন্দ্রের পানির মধ্যে গরুগুলোকে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন উন্মুক্ত স্থানে কাঁদা পানি রোদ বৃষ্টির মধ্যে রাখার কারণে গরুগুলো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

চরভদ্রাসন উপজেলার কে এম ডাঙ্গী গ্রামের তৈয়বুর রহমান বলেন, প্রায় এক বছর আগে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ষাঁড় গরু কিনেছিলাম। মোটাতাজা করে কোরবানির ঈদে বিক্রি করার আশায়। কিন্তু বন্যার পানিতে চরাঞ্চলের মাঠ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গরুকে কিছুই খেতে দিতে পারছি না। গত এক মাসে গরুটি শুকিয়ে অনেক ওজন কমে গেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) উপজেলা সদরের হাটে গরুটি বিক্রি করার জন্য নিয়েছিলাম। ব্যাপারীরা গরুটি ৫৫ হাজার টাকা দাম বলেছে বিধায় বাড়িতে ফেরত নিয়ে এসেছি। গরু এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরুগুলোকে ঠিক মতো খেতে দিতে পারছি না আবার দাম কমের কারণে বিক্রিও করতে পারছি না।

উপজেলার চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের খামারি এজিএম বাদল আমিন জানান, এ বছর বন্যায় গো-খাদ্যের সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মাঠের সমস্ত ফসল ডুবে যাওয়ার কারণে খড়কুটো বা ফসলের ছাঁটাই অংশও গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বছর কোরবানির জন্য পোষা গরুগুলো শুকিয়ে ওজন কমে গেছে। এবার চরাঞ্চলের প্রায় সব খামারিকে লোকসান গুনতে হবে।

জানা যায়, চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদী ঘেঁষে ৩টি ইউনিয়ন জুড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল চর। গো-খাদ্যে ভরপুর এসব চরাঞ্চলে গরু পালন করা হয়। উপজেলার চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের চরকালকিনিপুর, চরমির্জাপুর, চরতাহেরপুর, চরকল্যাণপুর, দিয়ারা গোপালপুর, চরহরিরামপুর ইউনিয়নের চরশালেপুর, ভাটিশালেপুর, উজান শালেপুর, চরহাজারবিঘা ও গাজীরটেক ইউনিয়নের মোহনমিয়া চরে বসবাসরত প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের জীবিকা অর্জনের প্রধান অবলম্বন হচ্ছে গরু পালন।

fpur-pic-03.jpg

বছর ধরে লালন-পালন করে তা কোরবানি ঈদে বিক্রি করেন তারা। পদ্মা নদীর এসব চরাঞ্চল জুড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল কাশবন এবং গো-চারণ ভূমি। তাই গো খাদ্যের জন্য চরবাসীর গরু পালনের জন্য বাড়তি ঘাস কিনতে হয় না। বছরজুড়ে গরু পুষে কোরবানির ঈদের আগে রাজধানী ঢাকায় গরু নিয়ে বিক্রি করে সারা বছর সংসারের খরচ মেটান চরবাসী।

কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে প্রবল বন্যার মধ্যেই কোরবানির ঈদ পড়েছে। চরাঞ্চলের প্রতিটি গৃহস্থ গত এক মাস ধরে গরু-ছাগল নিয়ে বাড়ি ছেড়ে রাত কাটাচ্ছে রাস্তায়। ঘাসের মাঠগুলো পানিতে ডুবে গেছে। গো-খাদ্যের অভাবে গরুগুলো শুকিয়ে হালকা হয়ে পড়েছে। ফলে স্বভাবতই এ বছর গরু বিক্রি করে অর্ধেক টাকাও পাবে না চরাঞ্চলের মানুষ।

চরকল্যাণপুর গ্রামের বাসিন্দা হাতেম শেখ বলেন, বসতভিটাসহ সমস্ত মাঠঘাট অথৈ পানিতে প্লাবিত হওয়ার পর গত এক মাস ধরে গরু নিয়ে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছি। খাদ্যর অভাবে গরুগুলো শুকিয়ে গেছে। এ বছর গরু বিক্রি করে অর্ধেক দামও পামু না।

আরেক বাসিন্দা মেহের আলী বলেন, এ বছর চরাঞ্চলে দুইবার বন্যা হওয়ায় সব গো-খাদ্য নষ্ট হয়ে গেছে। আবার পদ্মার চরে প্রচুর সাপের উপদ্রব থাকায় নৌকায় করে কাশবনের ডগাও আনতে পারছি না। এ বছর ঘাস কাটতে গিয়ে কয়েকজন সাপের কামড়ে মারা গেছেন। তাই কুড়ো, ভুসি খাইয়ে গরুগুলোকে কোনো মতে বাঁচিয়ে রেখেছি। এখন তাও পাচ্ছি না।

উপজেলা সদরের কোরবানির পশুর হাট ঘুরে জানা যায়, এ বছর হাটে কোরবানির গরুর আমদানি অনেক কম এবং বিক্রিও হয়েছে কম। গরুর হাট ইজারাদার আসলাম মোল্যা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ধেক গরুও কেনাবেচা হয়নি।

চরভদ্রাসন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দিবস রঞ্জন বাক্চী বলেন, চরাঞ্চলের প্রায় সবগুলো গো-খাদ্যের মাঠ পানিতে ডুবে রয়েছে। বন্যার স্থায়িত্বকাল প্রায় একমাস হওয়ায় খাবারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে গরুগুলোর ওজন কমছে। এ বছর গরুর মালিকদের লোকসান গুনতে হবে।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/এমএস