ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

আমদানিতে অনাগ্রহ ও করোনায় তছনছ ভোমরা বন্দরের রাজস্ব খাত

জেলা প্রতিনিধি | সাতক্ষীরা | প্রকাশিত: ০৮:৪৬ এএম, ২৬ জুলাই ২০২০

করোনা ভাইরাসের মহামারিতে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দরে অর্জিত হয়নি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। একদিকে ব্যবসায়ীরা হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন অন্যদিকে সরকারও হারিয়েছে বিপুল অংকের রাজস্ব। দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর বন্দরের আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম চালু হলেও ফেরেনি কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি। এছাড়াও ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ রাজস্ব ঘাটতির আরেকটি কারণ।

ভোমরা স্থল বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভোমরা স্থলবন্দরে আমদানি বাণিজ্যের উপর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এক হাজার ১৮৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি হয়েছে ৬০২ কোটি ৯৮ লাখ। চলতি ২০২০-২১ অর্থ বছরে আমদানি বাণিজ্যের উপর রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার দুই কোটি পাঁচ লাখ টাকা।

বাংলাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে গত ২৫ মার্চ থেকে সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ হয়ে যায় বন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। তিন মাস বন্ধের পর খুলে দেয়া হয় ১৯ জুন। ২০ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আমদানি কার্যক্রমের উপর রাজস্ব আদায় হয়েছে চার কোটি ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৩৪ টাকা। পহেলা জুলাই থেকে চলতি মাসের ২০ জুলাই পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার ৭৬১ টাকা। তিন মাস বন্ধের পর এখন পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার ৪৯৫ টাকা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার ৭৬১ টাকা।

ভোমরা স্থলবন্দর কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ এনাম হোসেন জানান, করোনা মহামারিসহ নানা কারণে বন্দরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ে ঘটতি রয়েছে ৬০২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আমদানিকারকরা ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া করোনার কারণে টানা তিন মাস বন্ধ ছিল ভোমরা বন্দর। তিন মাসে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। মূলত আমদানিতে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ ও করোনার কারণে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে বন্দরে। আমদানিকারকদের আমদানি কমিয়ে দেয়ার কারণ আমার জানা নেই। সেটি একজন ব্যবসায়ীর নিজস্ব ব্যাপার।

ভোমরা বন্দর দিয়ে বর্তমানে আমদানি হচ্ছে, আঙ্গুর, আপেল, আনার, টমেটো, কমলা, তরমুজ, আম, চাল, পানপাতা, মাছ (শুটকি মাছ ও তাজা মাছ), হলুদ, সিরামিক আইটেম, পাথর, ক্যাপসিক্যাম, শিল পাটা, আদা, রসুন, শুকনা মরিচ, খৈল, সয়াবিন ভূসি, তুলা, রাইস ব্যান্ড অয়েল, জিরা, মাছের খাদ্য, আগরবাতি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও খেজুর।

আমদানিকারকদের ভোমরা বন্দরের ব্যবহার কমিয়ে দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধাক্ষ্য ও এমঅ্যান্ডএস ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী মাকসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যেখানে সুবিধা পাবেন সেখানেই পণ্য আমদানি করবেন। ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে কোনো ছাড় দেয়া হয় না। যার কারণে ভোমরা বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব খাতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে কাঁচামাল পণ্য আমদানি করলে ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। যেমন এক ট্রাক টমেটো আমদানি করলে বেনাপোল বন্দরে পাঁচ টন ছাড়, আনার ১৮ টনে ২-৩ টন ছাড় এভাবে প্রতিটি পণ্যে ছাড় দেয়া হয়। ভোমরা বন্দরে এক কেজিও ছাড় দেয়া হয় না, আমদানিতে সময় ক্ষেপণসহ নানা অব্যবস্থাপনাও রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বেনাপোল বন্দরের দিকে ঝুঁকেছেন। ব্যবসায়ীদের একটু ছাড় দিলে ব্যবসায়ীরা আবারও ভোমরা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

মাকসুদুর রহমান আরও বলেন, করোনায় বন্দর বন্ধ থাকাকালীন সরকার যেমন রাজস্ব হারিয়েছে তেমনি বেকার হয়েছে বন্দরের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম সচল হলেও পূর্বের মতো বন্দরে সেই স্বাভাবিক গতি ফেরেনি। করোনা মহামারির আগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করত। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেত ১০০ ট্রাক। তবে বর্তমানে ভারত থেকে প্রতিদিন আসছে ২৭৫-৩০০ পণ্যবাহী ট্রাক আর ভারতে যাচ্ছে ৪০-৫০টি ট্রাক। বর্তমানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে সময় ক্ষেপণের কারণেও আমদানি ও রফতানি কমেছে।

ভোমরা স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন ভোমরা বন্দর প্রতিষ্ঠিত হয় তখন রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি টাকা। এখন হাজার কোটি টাকার বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মূলত বন্দর দিয়ে ৭৫টি পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ২৫-৩০ পণ্য আমদানি হয়। পার্শ্ববর্তী সোনা মসজিদ ও বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে ভোমরা বন্দরের প্রতিযোগিতা চলে শুরু থেকেই। পূর্বে বেনাপোল বন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও ফলমূল আমদানি হত না। ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানি করতেন। বর্তমানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও ফলমূল আমদানি হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীক সুবিধার্থে অনেক ব্যবসায়ী এখন বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করেন। ফলে ভোমরা বন্দরের রাজস্ব কমেছে। ব্যবসায়ীরা যেখানে বেশি সুবিধা পাবেন সেখানে ঝুঁকবেন এটিই স্বাভাবিক।

তবে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ভোমরা বন্দরের ডেপুটি ডিরেক্টর মনিরুল ইসলাম জানান, অতীতে কী হয়েছে জানি না। তবে বর্তমানে বন্দরে যে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। এভাবেই চলবে আমি যতদিন থাকব।

তিনি বলেন, করোনায় ভোমরা বন্দরের রাজস্ব খাতে কোনো ঘাটতি হয়নি। কাস্টমসে রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে তবে বন্দরে কোনো ঘাটতি নেই। স্বাভাবিক গতিতেই সব কার্যক্রম চলছে। ব্যবসায়ীদের অব্যবস্থাপনা অভিযোগটি সঠিক নয়। এছাড়া অন্য বন্দরে ছাড় দেয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা সেদিকে ঝুঁকছেন কিনা সেটিও আমি জানি না।

আকরামুল ইসলাম/এফএ/পিআর