করোনায় মানুষ স্বর্ণ কিনছে কম, বিক্রি করছে বেশি
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বর্ণ ব্যবসা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আনুপাতিক হারে ব্যবসা কমেছে ৯০ শতাংশ। এখন পর্যন্ত স্বর্ণ ব্যবসায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ব্যবসায় মন্দাভাব না কাটায় প্রতিদিনই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়। কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিয়েসহ সব ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবগুলোও সীমিত পরিসরে করা হচ্ছে। এতে করে স্বর্ণ বেচাকেনা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়াও মানুষের কাছে এখন টাকা-পয়সাও নেই যে স্বর্ণালংকার কিনবে। দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ার কারণে মানুষ এখন তাদের ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার বিক্রি করে দিচ্ছে।
জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতির দেয়া তথ্য মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক হাজারেরও বেশি জুয়েলারি দোকান আছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরেই আছে দুই শতাধিক দোকান। মূলত জেলা শহরের দোকাগুলোতেই জমজমাট থাকে স্বর্ণ বেচাকেনা। করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দোকানগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ভরিরও বেশি স্বর্ণালংকার বিক্রি হতো। আর সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে কেনা হতো ১০০ থেকে ১৫০ ভরির মতো স্বর্ণালংকার।
এখন প্রতি মাসে গড়ে ১০০ ভরির মতো স্বর্ণালংকার বিক্রি হচ্ছে। স্বর্ণালংকার কেনার বদলে সবাই এখন বিক্রি করতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন দোকানগুলোতে। ব্যবসায়ীরা এখন প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ভরি স্বর্ণালংকার কিনছেন গ্রাহকদের কাছ থেকে। বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে ৬৮ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে। আর গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ভরি স্বর্ণ ৬০ হাজার থেকে ৬২ হাজার টাকায় কিনছেন ব্যবসায়ীরা।
জেলা শহরের লাখী বাজারে স্বর্ণ বিক্রি করতে আসা মামুন মিয়া জানান, তিনি তার স্ত্রীর জন্য ৪৫ হাজার টাকায় এক ভরি ওজনের চেইন ও চুড়ি কিনেছিলেন। সংসার চালাতে টাকার প্রয়োজন তাই স্ত্রীর সেই চেইন ও চুড়ি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে করে তার লাভও হচ্ছে। আর এখন করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য।
শহরের নিউ মার্কেট এলাকার একটি জুয়েলারি দোকানে স্বর্ণ বিক্রি করতে আসা ফারহানা বেগম জানান, বছর দেড়েক আগে তার স্বামী বিদেশে থেকে তিন ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বিদেশে এখন তার স্বামী অর্ধেক বেতনে কাজ করছেন। এতে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে তার। তাই স্বর্ণের দাম বাড়ায় স্বর্ণালংকারগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্বামী আবারও বিদেশ থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে আসতে পারবেন- সেই আশায় বিক্রি করছেন তিনি। প্রতি ভরিতে ২৫ হাজার টাকা করে লাভ হচ্ছে তার।
এদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাস পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনায় অন্যসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবগুলো জুয়েলারি দোকান বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে জুন মাস থেকে দোকান খুললেও বেচাকেনা নেই। অথচ খরচ এক টাকাও কমেনি। দোকান ভাড়া, বৈদ্যুতিক বিল ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় ঠিকই মেটাতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নিউ মার্কেট রোডের মহালক্ষ্মী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী পিন্টু দেবনাথ বলেন, করোনাভাইরাসের আগে আমার দোকানে প্রতি মাসে ১৫-২০ ভরি স্বর্ণালংকার বিক্রি হতো। আর এখন মাসে এক ভরি স্বর্ণ বেচতেই কষ্ট হচ্ছে। এমনও দিন যায় অনেক দোকানে কোনো বেচাকেনা হয় না। মানুষের কাছে টাকা-পয়সা নেই, সেজন্য স্বর্ণ কেনার বদলে বিক্রি করতে আসছেন অনেকেই।
নিউ মার্কেট রোডের আনন্দ জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী হরি বণিক বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে টানা তিন মাস দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। জুন মাস থেকে দোকান খুললেও বেচাকেনা নেই বললেই চলে। আগে প্রতি মাসে ৩০-৪০ ভরি স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়েছে আমার দোকানে। এখন ৪-৫ ভরি স্বর্ণও বিক্রি হচ্ছে না। প্রতি মাসে ৮-১০ ভরি স্বর্ণ কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।
শহরের কালাইশ্রীপাড়া সড়কের উষা জুয়েলার্সের স্বত্ত্বাধিকারী সৈকত রায় বর্মণ বলেন, দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। মানুষ এখন মার্কেটে আসছেন স্বর্ণ বিক্রি করতে। করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করতে না পারায় আমরা অর্থ সঙ্কটে আছি। সেজন্য গ্রাহকদের কাছ থেক স্বর্ণ কিনতে পারছি না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার বণিক বলেন, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে আমাদের ব্যবসা ভালো হয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সব ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এখন ব্যবসা নেই বললেই চলে। গ্রাহকদের কাছে স্বর্ণ বিক্রির চেয়ে এখন কিনতে হচ্ছে বেশি।
তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এখন পর্যন্ত আমাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। মন্দাভাব না কাটায় প্রতিদিনই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। কীভাবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেব সেটি আমাদের জানা নেই। ব্যবসা আবার আগের মতো ভালো হবে শুধু এই আশায় আছি।
আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমএস