EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

দুর্যোগ-দুর্ভোগে নিঃস্ব উপকূলবাসী

আকরামুল ইসলাম | সাতক্ষীরা | প্রকাশিত: ০১:৩৪ পিএম, ১২ নভেম্বর ২০২০

আজ ১২ নভেম্বর প্রস্তাবিত উপকূল দিবস। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত হয়েছে উপকূলবাসী। একটি আঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকৃতির আরেকটি আঘাত। এভাবেই সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ মানুষ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দুর্ভোগের যেন শেষ নেই এসব মানুষের। আইলা থেকে আম্ফান সব দুর্যোগেই ভেঙেছে উপকূল রক্ষার বেড়িবাঁধ। ভেসে গেছে মাছের ঘের, ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। নিরুপায় হয়ে বসতভিটা ছাড়ছেন অনেক উপকূলের বাসিন্দা।

২০০৯ সালের ২৫ মে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আইলায় লন্ডভন্ড হয়ে যায় সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ। ২৮ কিলোমিটার উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। নিহত হয় শিশুসহ ৭৩ জন নারী-পুরুষ। এর মধ্যে ৫৩ জন মারা যায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে। বাকি ২০ জন পার্শ্ববর্তী পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।

১৯৮৮ সালের ভয়ঙ্কর ঝড়ের পর আইলা সব থেকে বিধ্বংসী হয়ে সাতক্ষীরা উপকূলে আঘাত হানে। আইলার সেই ক্ষত আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী। আজও শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এসব জনপদে আইলার ক্ষত স্পষ্ট।

এরপর ২০১৯ সালের ৪ মে ফনি, ওই বছরের ১০ নভেম্বর বুলবুল ও সবশেষ ২০২০ সালের ২০ মে আম্ফান আঘাত হানে। ফনি ও বুলবুলের প্রভাবে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি না হলেও আম্ফানে আবারও তছনছ হয়ে যায় উপকূল।

Satkhira

আম্ফানের প্রভাবে উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ ভেঙে ও ঝড়ের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গাছপালা ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি ও সদর উপজেলায় ২৩টি স্থানে ৩১ কিলোমিটার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেসে যায় ৫০টি গ্রাম। শুধুমাত্র শ্যামনগর উপজেলাতেই প্লাবিত হয় ২৫টি গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ।

অন্যদিকে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় এসব উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধগুলো সরকার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সংস্কার কাজ শুরু হওয়ার ঘোষণা দিলেও এখনও তা শুরু হয়নি। বাঁশ ও মাটির বস্তা ফেলে রিং বাঁধ দিয়ে প্রাথমিকভাবে এসব বাঁধ রক্ষা করছে গ্রামবাসী।

গত ২০ আগস্ট অতিবৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারের তোড়ে আবারও জোড়াতালি দিয়ে দেয়া রিং বাঁধ পুনরায় ভেঙে আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা, প্রতাপনগর ও আশাশুনি সদরের ৪১টি গ্রাম প্লাবিত হয়। দিশেহারা হয়ে পড়ে এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদী এখন উপকূলীয় এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণের শেষ ইউনিয়ন গাবুরা। এটিকে দ্বীপ ইউনিয়নও বলা হয়। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রথমেই আঘাত হানে এই জনপদে।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, একের পর এক প্রাকৃতিক দূর্যোগে দিশেহারা মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেই হারিয়েছে বসতভিটা।

Satkhira

তিনি বলেন, এলাকায় এখন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই, খাবার পানির সংকট। জীবিকার তাগিদে এলাকার হাজারো মানুষ এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন। উপকূলীয় বাঁধ ভাঙন যদি স্থায়ীভাবে রোধ করা যায় তবেই এ জনপদ আগামী দিনে বসবাসের উপযোগী হবে।

‘এলাকায় কোনো রাস্তাঘাট ভালো নেই, মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বন্ধে স্থায়ী সমাধান দরকার। আর সেটি করতে হলে একমাত্র উপায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ। আমরা ত্রাণ চাই না, উপকূল রক্ষা টেকসই বাঁধ চাই।’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ.ন.ম আবুজর গিফারী বলেন, আমফানের পর জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসীর সহযোগিতায় রিং বাঁধ দেয়া হয়েছিল। সেগুলো এখনো তেমনই রয়েছে। তাছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু কাজ করেছে। সেনাবাহিনীর বাঁধ রক্ষায় যে কাজ করার কথা ছিল সেটি এখনও শুরু হয়নি।

আশাশুনির প্রাতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হেনেছে সাড়ে পাঁচ মাস হলো। এখনো ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতের কাজ শুরুই হয়নি। ৯টি ওয়ার্ডে নদীর জোয়ারের পানি উঠানামা করছে। কিছু মানুষ এলাকা থেকে বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে।

Satkhira

তিনি বলেন, ইউনিয়নের হরিশখালি পয়েন্টে বাঁধ রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদার নিয়োগ করে কার্যক্রম চালাচ্ছে তবে গত দুই মাসেও শেষ করতে পারেনি।

অন্যদিকে কুড়িকাউনিয়া এলাকায় ৫০০ মিটার বাঁধ আজও ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। আম্ফান ও তারপর নদীর জোয়ারের তোড়ে এসব বাঁধ ভেঙে যায়। চাকলা পয়েন্টে দুই কিলোমিটার বাঁধও ভাঙনের মুখে রয়েছে।

শ্রীউলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল জানান, শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালি এলাকায় বাঁধ এখনও ভাঙা। লোকালয়ে পানি প্রবেশ ঠেকাতে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে হাজরাখালী থেকে হিজলিয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সাড়ে সাত কিলোমিটার রিং বাঁধ দেয়া হয়েছে। সরকার কোনো সহায়তা করেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁশ ও বস্তা দিতে চেয়েছিল সেটিও তারা দেয়নি।

সাতক্ষীরা জেলায় উপকূল জুড়ে রয়েছে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জেলায় দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড-২।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ (কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলা) আবুল খায়ের জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর আওতায় উপকূলীয় এলাকায় ৩৮০ কিলোমিটার উপকূল রক্ষা বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ১৮ কিলোমিটার বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কার করবে। বাকি ১৬ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের জন্য জাইকাকে প্রপোজ করা হয়েছে। জাইকা কর্তৃপক্ষও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করছি চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত আগামী এক মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে।

Satkhira-(4)

এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় থাকা ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে সেনাবাহিনীও ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে কাজ করবে। সেনাবাহিনীর কাজও দ্রুত শুরু হবে। মন্ত্রণালয়ে ২৩ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়েছি তবে এখনও পাওয়া যায়নি। স্থায়ী বাঁধ সংস্কারের জন্যও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ (আশাশুনি) সুধাংশু সরকার বলেন, আম্ফান পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর আওতাধীন ২৮৪টি পয়েন্টে ৮৩.৮২৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে ৮২টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে ২০.১৪৮ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। এটার প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছে ২০.৫৭ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ১২.৪৬ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের। আম্ফান পরবর্তীতে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করলেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা আবারও কাজ শুরু করবে। এছাড়া বাঁধের বাকি অংশটুকু কম ক্ষতিগ্রস্ত। সেগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা হবে।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক ও উপপরিচালক স্থানীয় সরকার) মো. বদিউজ্জামান বলেন, সাতক্ষীরা একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত প্রথমে পড়ে এ জেলার উপকূলীয় এলাকায়। ভাঙন কবলিত বাঁধ রক্ষার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম রয়েছে।

তিনি বলেন, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আমরা সরকারি খাস জমি দিতে পারি। তবে এমন কেউ এখনো আবেদন করেনি। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন কেউ আবেদন করলে তাদের জন্য সরকারের খাস জমির বন্দোবস্ত করা হবে।

এফএ/পিআর