EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

দুঃখ ঘুচতে চলেছে বাগেরহাটের উপকূলবাসীর

জেলা প্রতিনিধি | বাগেরহাট | প্রকাশিত: ০১:১২ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২০

সুপার সাইক্লোন সিডরের পর বাগেরহাটের উপকূলীয় জনপদ শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ এলাকার জনগণের জানমাল রক্ষার্থে শুরু হয় ৬৩ কিলোমিটার টেকসই বাঁধের নির্মাণ কাজ। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সিইআইপি প্রকল্পের এ বেড়িবাঁধের প্রায় ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

এরইমধ্যে প্রমত্তা বলেশ্বর পাড়ের এ বাঁধ রক্ষা ও নদী শাসনের জন্য অনুমোদন পেতে চলেছে ৮শ কোটি টাকা। রোববার বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-১ এর আওতায় বাগেরহাটের শরণখোলার ৩৫/১ পোল্ডারের চলমান টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ এলাকার মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। দীর্ঘদিনের দাবির ফলেই সরকার এই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। যার বাস্তবায়ন হবে ২০২১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে।

jagonews24

একইসঙ্গে সব থেকে ভাঙন কবলিত শরণখোলার বগী এলাকার আড়াই কিলোমিটার বাঁধের নির্মাণ কাজের তদারকি করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কাজের মান নিয়েও এলাকাবাসী সন্তুষ্ট। এত টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বাঁধ টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অবশেষে নদী শাসনের জন্যও মিলছে বরাদ্দ।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সিডরের পর ২০১৪ সালে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শরণখোলায় ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণে সিসি ব্লক ফেলে কাজ হলেও তার মান নিয়ে ছিল হতাশা। ইতোমধ্যে নির্মাণকৃত সেই বেড়িবাঁধের অনেক স্থানে ভাঙনসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তবে এলাকার সাধারণ মানুষের মতে, সিডরের পর এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সাইক্লোন সেল্টারের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের উদ্যোগে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় শরণখোলার মানুষ চিন্তামুক্ত। ৩৫/১ পোল্ডারের ৬৩ কিলোমিটার বাঁধ নতুনভাবে নির্মিত হলে বলেশ্বর নদী সংলগ্ন মানুষের আর ডুবে মরতে হবে না। ঘুচবে তাদের দুঃখ ও দুর্দশা।

jagonews24

বাঁধের বিষয়ে কথা হয় শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমল হোসের মুক্তার সঙ্গে। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন বাঁধের সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তিনি টেকসই বাঁধের সঙ্গে ড্রেন নির্মাণের জন্য শরণখোলাবাসীর পক্ষে দাবি জানান।

শরণখোলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিডর বিধ্বস্ত ১৫১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শরণখোলা উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। টেকশই বেড়িবাঁধ ও আবাসন সংকটের কারণে উপজেলার রাজেশ্বর, কদমতলা, চাল রায়েন্দা, জিলবুনিয়া, রায়েন্দা বাজার, তাফালবাড়ী, বগী, খুড়ীয়াখালী, তেড়াবেকা, সোনাতলা, গাবতলা ও সাউথখালীসহ ২১টি গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলন জানান, এখনও প্রতিদিন বলেশ্বর নদীর পাড়ের হাজার হাজার মানুষ জীবন জীবিকার জন্য সংগ্রাম করছে। নদী ও পার্শ্ববর্তী সুন্দরবনকে ঘিরেই এখানকার ৯০ শতাংশ মানুষের জীবন জীবিকা।

তিনি বলেন, সিডরের পর শরণখোলায় যে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে তার অনেকাংশ আবার পানির তোড়ে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তাই এলাকার মানুষের জানমাল রক্ষার্থে নদী শাসন করে পরবর্তীতে টেকসই বেড়িবাঁধ করা প্রয়োজন।

jagonews24

শরণখোলা উপজেলার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান রায়হান উদ্দিন শান্তজানান, সিডরের পর বলেশ্বর পাড়ের এই মানুষগুলোর প্রধান দাবি হয়ে ওঠে টেকসই বাঁধ। দীর্ঘদিন পর কাঙ্ক্ষিত সেই বাঁধ এখন শেষ পর্যায়ে। নদী শাসনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন বাঁধের অনেক স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন জরুরি হয়ে গেছে নদী শাসন। দীর্ঘ দিন ধরে আমরা এলাকাবাসীর পক্ষে এ দাবি জানিয়ে আসছি। নদী শাসন করে তারপর বাঁধের কাজ শেষ করতে তিনি অনুরোধ জানান।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, শরণখোলার ওই এলাকার নদী শাসনের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ফিল্ড লেভেল থেকে আমরা যে প্রস্তাব পাঠিয়েছি সেটি অনুমোদিত হয়েছে। ৮শ কোটি টাকার অধিক নদী শাসনের প্রকল্প পাইপ লাইনে আছে। খুব দ্রুতই এটা চলে আসবে। এটা পেলেই শরণখোলা মোড়েলগঞ্জ উপজেলার মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সুপার সাইক্লোন সিডর বাগেরহাটসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে। সিডর আঘাত হানার ১৩ বছর পরও বাগেরহাটের শরণখোলাসহ ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনও রয়েছে গৃহহীন। জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষায় এখনও নেই পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র।
এই সর্বনাশা সাইক্লোন কেড়ে নেয় বাগেরহাট জেলার ৯৩১ জনের প্রাণ। সুপার সাইক্লোন সিডরে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জের ৬২.৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। থমকে যায় ৪ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা।

বাগেরহাট জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় পৌনে ২শ কোটি টাকা এলেও একযুগ পরও সেখানকার মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এখনও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সতর্ক সংকেত এলেই উপকূলীয় শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ এলাকার ৪ লক্ষাধিক মানুষের মনে আতঙ্ক ভর করে।

এফএ/জেআইএম