ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ব্রিটিশ আমলে তৈরি চারিতালুক পালবাড়ির বেহাল দশা

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) | প্রকাশিত: ০৬:২৯ পিএম, ২২ ডিসেম্বর ২০২০

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নজরদারি এড়িয়ে এবং উপজেলা ভূমি অফিসকে একটি বিনিময় দলিলের মাধ্যমে মালিকানার দাবি করে ব্রিটিশ আমলে তৈরি প্রাচীন একটি স্থাপনায় বসবাস করছে বেশকিছু পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, এখানে বসবাসকারীরা ঐতিহাসিক পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী মীর জাফরের উত্তরসূরী।

তবে বসবাসকারীরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার নানা নবাব আলীবর্দী খাঁ, কিংবা মুর্শিদাবাদের জালালপুর গ্রামে বসবাস এবং নবাব পরিবারের সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের যোগাযোগের কথা স্বীকার করলেও, মীর জাফরের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের স্বীকার করতে চাননি।

এলাকাবাসীর দাবি, তারা মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন মীর জাফরের কুকর্মের ঘৃণায় ও লোকলজ্জার ভয়ে ওই এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যান। এদিকে দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চারিতালুকের পালবাড়িটি জরাজীর্ণ হয়ে এখন বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার ভোলাবো ইউনিয়নের অধীনে মোচার তালুক মৌজার চারিতালুক গ্রামে রয়েছে একটি প্রাচীন দালান, যা মৌজাটির আরএস ৮৮৯ নং খতিয়ানের ৩১ শতক জমি থেকে কেবল ৬ শতক জমির উপর দ্বিতল ভবনে পুরনো স্থাপত্যের নিদর্শন নিয়ে কালের বিবর্তনে জরাজীর্ণ আর অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িছে আছে।

jagonews24

পালবাড়ির বেহাল দশা

কোনো ধরনের নামফলক কিংবা সাইনবোর্ড না থাকায় স্থানীয় ভূমি অফিস ও প্রবীণ বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বাড়িটি ব্রিটিশ আমলে অভিজাত জমিদারদের আবাসস্থল ছিল। যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন শাসক পাল রাজাদের বংশধর ও জোতদাররা বসবাস করতেন। পাল রাজার অধীনে জমিদার ছিলেন জোতদাররা। জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলে বা ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর ওই পালরা এখানকার জমিদারি ও ঘরবাড়ি ফেলে চলে যান ভারতের মুর্শিদাবাদ ও কলকাতাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। সেখানে চলে গেলে সরকারি বিধিব্যবস্থায় বিনিময় দলিলের মাধ্যমে ওই পালদের জমিতে ফেরত আসেন মুর্শিদাবাদের জালালপুর গ্রামের খান বংশীয় বেশ কয়েকটি পরিবার।

কথিত আছে, ওই খান বংশের পূর্বপুরুষ হলেন মীর জাফর, যার সম্পূর্ণ নাম সৈয়দ মীর জাফর আলী খান। তার জন্ম ১৬৯১ সালে এবং মৃত্যু ১৭৬৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি ইংরেজ প্রভাবিত বাংলার একজন নবাব ছিলেন। সেই মীর জাফরের উত্তরসূরীরা কালের বিবর্তে মুর্শিদাবাদের নেমক হারাম ডেওরিতে (মীর জাফরের বাড়ি) স্থানীয়দের দ্বারা অবাঞ্ছিত ঘোষণা হলে, লোকলজ্জা ও ঘৃণায় সেখানে বসবাস করতে পারেননি। তাই তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যান। তারা মীর জাফরের উত্তরসূরী পরিচয় গোপন করতে থাকেন।

সূত্র জানায়, এদের কিছু অংশ সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় অস্থায়ীভাবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভোলাবো এলাকায় চলে আসেন। যদিও এখানকার বাসিন্দারা বংশগত যোগসূত্রের বিষয়টি স্বীকার করেননি। তাদের দাবি, তারা ১৯৬৭ সালে মুর্শিদাবাদের জালালপুর গ্রামের (বর্তমানে পদ্মায় বিলীন হওয়া একটি নিশ্চিহ্ন গ্রাম) বাসিন্দা।

এসব বিষয়ে কথা হয় পালবাড়িতে বসবাসরত ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ হাজী আমানুল্লাহ আমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় প্রথম অস্থায়ীভাবে আমার বাবা আহসান উল্লাহ খান মাস্টার বাংলাদেশে আসেন। সে সময় আমরা মুর্শিদাবাদের জালালপুর গ্রামে বসবাস করতাম। পাশাপাশি বর্তমান পুরান ঢাকায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। আমার বাবা ভোলাবো এলাকার পালবাড়ির কথা ও এখানকার জোতদারদের কথা জানতে পারেন। আমরাও শুনেছি এখানে পালরা বসবাস করতেন। ১৯৬৭ সালে আমরা তিন ভাই— হাজি আমানুল্লাহ, খাইরুল আলম ও গোলাম কিবয়িরা তোতাসহ জালালপুর গ্রামের বেশকিছু পরিবার এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করি। প্রথমে মৌখিকভাবে পালদের রেখে যাওয়া ঘরবাড়িতে বসবাস শুরু করি। তখন এ বাড়িটির জৌলুশ ছিল। দর্শনার্থীরাও দেখতে আসতেন। বাড়িটি নির্মাণকাল সম্পর্ক কোনো তথ্য পাইনি। আমরাও কৌতূহলী হয়ে আশপাশের শতবর্ষী প্রবীণ বাসিন্দাদের কাছে পুরনো এ ভবন নির্মাণের সময় ও ইতিহাস জানতে চাইতাম। তবে তারাও ছোটবেলা থেকে এ ভবনকে এমনই দেখে আসছেন বলে দাবি করেন। ভবনটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো হবে।’

এ বাড়িতে বসবাসের বৈধতা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মোচার তালুক মৌজার আরএস রেকর্ড অনুযায়ী মালিক নরেন্দ্র চন্দ্র পালের ছেলে অজীত কুমার পাল, প্রদীপ কুমার পাল ও সুধীর চন্দ্র পালদের কাছ থেকে আমরা তিন ভাই ১৯৭৩ সালের ২৬ নভেম্বর ২৮৩৩৭ নং বিনিময় দলিলমূলে, ২২১ বিঘা জমি থেকে এ সম্পদ পাই। এভাবে অন্যান্য পরিবারও বিনিময় দলিলমূলে মালিক হয়ে এ অঞ্চলে বৈধভাবে বসবাস করে আসছেন।’

jagonews24

বিভিন্ন স্থান থেকে ভবনটি দেখতে আসেন দর্শনার্থীরা

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ মীর জাফর কিংবা তাদের বংশের লোক ছিলেন না। আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে আসায় ঝগড়াঝাটি হলে স্থানীয়রা এসব বলেন, যা সত্য নয়। তবে নবাব পরিবারের সাথে পূর্বপুরুষদের যোগসাজশ ছিল। দাদার কাছ থেকে এবং বইপুস্তক থেকে এসব জেনেছি। কারণ, আমরা নবাব আলীবর্দী খাঁর সেনাপতি জালালউদ্দিনের অধীনস্থ ছিলাম বলেই জানতাম।’

পালবাড়ির আরেক বাসিন্দা আইনজীবী আরশাদ আলী বলেন, ‘আমার পূর্ব পুরুষরা কী অবস্থায় ছিলেন জানা নেই। তারা মুর্শিদাবাদের জালালপুর গ্রাম থেকে এখানে এসেছেন। আমার জন্ম বাংলাদেশেই। এ ভবনটি পুরনো স্থাপনা হওয়ায় কেউ সংস্কারের উদ্যোগ নেননি। সরকারিভাবেও আমাদের কোনো বাধা দেয়া হয়নি। বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এ ভবন দেখতে আসেন। আশপাশে বাড়িঘর থাকায় দর্শনার্থীরা আসলে অসুবিধা হয়।’

স্থানীয় সাংবাদিক মাহবুব আলম প্রিয় বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এই পালবাড়ির মাধ্যমে ভোলাবোর পরিচয় ফুটে ওঠে। রূপগঞ্জ উপজেলাকে যেমন মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির মাধ্যমে চেনা যায়, তেমনি ভোলাবো ইউনিয়নের এ স্থাপনা গুরুত্ব বহন করে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রহস্যজনক কারণে এসব পুরনো ভবন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। এতে প্রাচীন ঐতিহ্য বিলীনের পথে।’

আবার স্থানীয় বাসিন্দারা পুরনো এ ভবন রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভবনটি ব্যক্তি মালিকানায় থাকলেও তাদের কাছ থেকে ক্রয় করে তা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে, ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশনার কোনো তথ্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে নেই। ভোলাবো ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (সহকারী নায়েব) সঞ্জয় কুমার ভাওয়াল বলেন, ‘এটা আরএস রেকর্ডীয় সূত্রে ভবনটি ব্যক্তিগত মালিকানার জমিতে অবস্থিত। যারা বসবাস করছেন তারা বিনিময় দলিলের মাধ্যমে বৈধভাবে মালিক হয়ে বসবাস করছেন বলে জানি। ফলে তা সরকারিভাবে সংরক্ষণের উপায় নেই।’

jagonews24

ভবনটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো

এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফিফা খান বলেন, ‘চারিতালুকের পালবাড়িটির বিষয়ে জেনেছি। এটা ঐতিহাসিক নিদর্শন। ঊর্ধ্বতন মহল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানিয়ে এটাকে সংরক্ষণের জন্য শিগগিরই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

নবাব সিরাজউদ্দৌলা বা মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। পলাশীর যুদ্ধে তার পরাজয় ও মৃত্যুর পরই ভারতবর্ষে ১৯০ বছরের ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। সিরাজউদ্দৌলা তার নানা নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে ২৩ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে সিংহাসনে বসেন। তার সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে।

অপরদিকে, পাল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ধ্রুপদি যুগের একটি সাম্রাজ্য। এ সাম্রাজ্যের উৎসস্থল ছিল বাংলা অঞ্চল। পাল সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয় এ সাম্রাজ্যের শাসক রাজবংশের নামানুসারে। প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় এই শব্দটির অর্থ ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। তাদের রাজত্বকালেই প্রাচীন বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দীতে হিন্দু সেন রাজবংশের পুনরুত্থানের ফলে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম সুবর্ণ যুগ মনে করা হয়। বাংলার প্রথম সাহিত্যকীর্তি চর্যাপদ পাল যুগেই রচিত হয়েছিল। ওই পাল রাজাদের বংশধর ও জোতদারদের কালের বিবর্তনে বিদায় ঘণ্টার পর রূপগঞ্জের এ ভোলাবো অঞ্চলে বিনিময় দলিলের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদ থেকে এসে প্রায় ২৬টি পরিবার বসবাস শুরু করে। পালবাড়িটি দেশের দর্শনীয় স্থানের একটি।

মীর আব্দুল আলীম/ইএ/এমএসএইচ/এমকেএইচ