EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বাগেরহাটে খানজাহানের আগমন ও ষাটগম্বুজ মসজিদ

জেলা প্রতিনিধি | বাগেরহাট | প্রকাশিত: ১১:৫৭ এএম, ১৫ এপ্রিল ২০২১

বাংলাদেশে অবস্থিত মধ্যযুগীয় মসজিদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ষাটগম্বুজ মসজিদ। সুলতান নসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের আমলে ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে খান-উল-আযম উলুঘ খান-ই-জাহান যিনি খান জাহান আলী (রঃ) নামে বেশি পরিচিত এটি নির্মাণ করেন। এই বিশিষ্ট ইসলাম প্রচারক ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

খান জাহানের (রঃ) বাবার নাম আকবর খাঁ এবং মায়ের নাম আম্বিয়া বিবি। বাবার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর দিল্লীর বিখ্যাত ওয়ালি কামিল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করার পর তুঘলক সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন। অতি অল্প সময়েই নিজ যোগ্যতায় প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন।

১৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশে গভর্ণর পদে নিয়োগ পান। পরবতী সময়ে হযরত খানজাহান (রঃ) বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে এসে জনকল্যাণে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময় যশোর-খুলনা-বাগেরহাট- সাতক্ষীরা ও বরিশালের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত রাজ্যটির নাম ছিল খলিফাতাবাদ। পরবর্তীতে এই রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মোহাম্মদ আবু তাহেরকে (মেহেরপুরের বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ গোবিন্দ ঠাকুর) নিয়োজিত করেছিলেন।

খলিফাতাবাদের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল বর্তমান বাগেরহাট জেলার ষাটগুম্বুজ মসজিদ। এখান থেকেই রাজ্যের প্রধান খানজাহান (রঃ) সকল প্রশাসনিক কর্যক্রম পরিচালনা করতেন। ওই সময়ে রাজ্যটি তিনটি পরগনায় বিভক্ত ছিল।

যা যশোর, বেতকাশী ও বাগেরহাট নামে পরিচিত ছিল। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল বাগেরহাটের হাবেলী খলিফাতাবাদ পরগনায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কির কাছে বাংলার ইসলাম রক্ষা ও প্রচারের জন্য নুর-ই কুতুব-উল আলম নামের এক ধর্মীয় গুরু ৬০ হাজার সৈন্য চান। আধ্যাত্মিক এই ধর্মীয় গুরুর কথামতো সুলতান ৬০ হাজার সৈন্য পাঠান। ওই ধর্মীয় গুরু এই সৈন্যদল পরিচালনার দায়িত্ব দেন তার অনুসারী খানজাহানের (রঃ) উপর। খানজাহান ওই সময়ে সুলতানের অনুমতি নিয়ে তার অনুসারী ১১ জন আউলিয়া ও যোদ্ধাসহ ৬০ হাজার সৈন্য বহর নিয়ে গনেশের রাজধানী গৌড়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় আসেন। ১৪১২-১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ঝিনাইদহের বারবাজারে খানজাহান তার সৈন্য দলসহ প্রথম ঘাঁটি গাড়েন।

আধ্যাত্মিক গুরু নুর-ই-কুতুব-উল আলম ধর্ম প্রচারের এই কাফেলায় খানজাহানসহ যে ১১ জন ব্যক্তিকে মনোনিত করেছিলেন ঝিনাইদাহে এই ১১ জন ধর্মীয় বিশিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানকালীন সময়ে ওই এলাকার নাম হয় বারোবাজার।

বারোবাজারে অবস্থানকালে রাজা গনেশ তার এক সুসজ্জিত সৈন্যদলকে পাঠান। কিন্তু বারবাজারের অদূরে বিজয়পুর নামক স্থানে তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। পরবতীর্তে বিভিন্ন সময়ে ওই পরাজিত সৈন্যদল খানজাহানের ধর্ম প্রচারে বাধা সৃষ্টি করলেও সফল হয়নি।

jagonews24

বারোবাজারে অবস্থান কালীন সময়ে খানজাহান সেখানে জনকল্যাণে তিনি দিঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে বারোবাজারের দায়িত্বভার খানজাহানের সাথে থাকা অনুসারী রেবাস শাহ’র নিকট অর্পণ করে ধর্মপ্রচারের জন্য ভৈরব নদীর উপকূল ধরে অগ্রসর হন। সেখানে সৈন্যদল ও অনুসারীদের সাথে নিয়ে বেশ কিছু দিঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণ করে নগর গড়ে তোলেন।

ওই স্থানের বৌদ্ধদের দেয়া নাম মুরালী পরিবর্তন করে রাখা হয় মুরালী কসবা। এই মুরালী কসবা শহরের অদূরে তিনি আরেকটি শহর গড়ে তোলেন যার নাম দেন ছানি কসবা যা পরিবর্তীকালে পুরাতন কসবা নামে পরিচিত ছিল। এই পুরাতন কসবাই বর্তমানকালের যশোর জেলা।

পরবর্তীতে খানজাহান (রঃ) তার দুই প্রধান সহচর গরিব শাহ ও বোরহান শাহ’র ওপর ওই এলাকার দায়িত্বভার অর্পণ করে বর্তমান মেহেরপুরের পূর্বে পায়গ্রামে ঘাঁটি গাড়েন। কিছুকাল পায়গ্রাম কসবায় অবস্থান করার পর তিনি মির্জাপুর ও গোপালপুরে কয়েকটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

তারও কিছুকাল পরে মেহেরউদ্দীন খানকে সেখানকার দায়িত্বে রেখে আবারও দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হন। মেহের উদ্দীন পীরের নাম অনুসারে পরে ওই স্থানের নাম হয় মেহেরপুর। ওই সময়ে অনেক হিন্দু ব্রাহ্মণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, যার মধ্যে গোবিন্দ ঠাকুর অন্যতম। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আবু তাহের। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি খানজাহান (র:) সহচার্যে থেকে প্রধান অনুসারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খানজাহানের (রঃ) মাজারের পাশেই তাকে পরবর্তীতে দাফন করা হয়।

খানজাহান (রঃ) রাজা গনেশের সুশিক্ষিত পলাতক সেনাবাহিনী সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকতেন। বর্তমান বাগেরহাট ছিল সুন্দরবনের খাদি অঞ্চলের সমতটভূমি। এখানে মগ মূর্তিপূজক, তান্তিক ও জলদস্যুরা আবাসস্থল গড়ে তুলেছিল। রাজা গনেশের পলাতক সৈন্যদল ও এই সমতটভূমিতে আবাসস্থল গড়ে তোলা তান্ত্রিক ও জলদস্যুদের সাথে নিয়ে খানজাহানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে। এমনকি এ অঞ্চলের মগরাজ কর্নওয়ালি তার হস্তি বাহিনী দিয়ে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

এ সংবাদ পেয়ে খানজাহান পায়গ্রাম কসবা বা মেহেরপুর থেকে বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পায়গ্রাম কসবা থেকে খুলনার সেনের বাজার, সামান্তসেনা রাংদিয়া পিলজং হয়ে বাগেরহাটের ষাটগুম্বুজ পৌঁছাতে খানজাহানকে মগরাজার সৈন্যদলকে পরাজিতসহ অনেক বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়।

jagonews24

এর মধ্যে ফকিরহাটের পিলজং এলাকায় মগরাজার হস্তিবাহিনীর সাথে তার অনুসারীদের তুমুল যুদ্ধে অনেকেই শহীদ হন। হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম হওয়া মোহাম্মদ আবু তাহেরের সাথে আনেক ব্রাহ্মণও ওই যুদ্ধে খানজাহানের পক্ষে অংশ নিয়ে মারা যায়। যুদ্ধে জয়ী হয়ে পরে তিনি বারাকপুরে ছাউনি ফেলে বাদোখালী বিল পার হয়ে সুন্দরঘোনা গ্রামে এসে উপস্থিত হন।

বারাকপুরে পাকা রাস্তা ও শিবির স্থাপন করার পর পাশের সুন্দরঘোনা গ্রামে বিশাল দিঘি খনন করেন। যা ঘোড়াদিঘি নামে পরিচিত। এই ঘোড়াদিঘির অদূরে উত্তর দিকে খানজাহানের বসতবাটি। আর ঘোড়াদিঘির পূর্ব পাড়েই তিনি তার শিবির পুনরায় স্থানাস্তর করে তৈরি করেন ষাটগম্বুজ মসজিদ।

খানজাহান (রাঃ) খলিফাতাবাদ রাজ্যের রাজধানীতে শাসনকার্য পরিচালনা ও বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন যা ষাটগম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটি আনুমানিক ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০৮ ফুট চওড়া। মসজিদের দেয়াল ৮ ফুট ৩ ইঞ্চি পুরু। নিচের মেঝ থেকে এর উচ্চতা ২১ ফুট। এটি নির্মাণ করতে ব্যবহৃত হয়েছে টালি ইট, চুন-সুড়কি, টেরাকোটা বা পোড়া মাটির ফলক।

বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার এবং খানজাহানের দরগাহ থেকে মসজিদটির দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার।

৬০টি বড় পাথরের খাম্বা বা স্তম্ভের উপর তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলীতে অপরূপ এই স্থাপনাটির উপরে উত্তর-দক্ষিণে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে ১১টি গম্বুজ এবং পূর্ব-পশ্চিমে সারিবদ্ধভাবে আছে আরও ৭টি গুম্বুজ।
যার ৭০টি গোলাকার ও ৭টি বর্গাকার এবং চারধারে ছাদ থেকে খানিকটা উঁচুতে আরও ৪টি গম্বুজ দৃশ্যমান।

এই মনোরম সুন্দর স্থাপনার উপরের অংশে সর্বমোট ৮১টি গুম্বুজ থাকলেও যেহেতু মূল জায়গায় ৬০টি স্তম্ভের ওপর এটি দাঁড়িয়ে আছে। সে কারণেই এটিকে ষাটগুম্বুজ মসজিদ বলা হয়। মসজিদের পূর্ব দিকে ১১টি প্রবেশদ্বার, যার মাঝখানেরটি আকারে সবচেয়ে বড়।

মসজিদের ভেতরে ১৪৪ ফুট লম্বা ও ৯৬ ফুট চওড়া স্থানে খানজাহান (রঃ) ও তার অনুসারীরা নামাজ আদায় করতেন। পাশাপাশি শাসনকার্য পরিচালনার জন্য দরবারগৃহ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এখানে মাদরাসার কার্যক্রম এবং আরবি ও ফার্সি ভাষা শিক্ষাও দেয়া হতো।

মসজিদের অভ্যন্তরের পূর্বের নির্মাণশৈলী ছিল খুবই সুন্দর। পরবর্তীতে সংস্কার করার কারণে মসজিদের সৌন্দর্য অনেকখানি নষ্ট হয়। ১৮৭১ সালে ষাটগুম্বুজের সর্বত্র জঙ্গলাবৃত ছিল। পরবর্তিতে ১৯০৪ সালে এই স্থাপনা সরকারের তত্ত্বাবধানে আসে। ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে এ মসজিদটি বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

পূর্বে খলিফাতাবাদ নামের এই সমৃদ্ধ শহরটি অসংখ্য মসজিদ, ইমারত, দিঘি, রাস্তা ও সমাধিসৌধ দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। যার অধিকাংশেরই এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

টিকে থাকা উল্লেখযোগ্য নিদর্শনসমূহের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য হল সিঙ্গাইর মসজিদ, বিবিবেগনী মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, রেজাখোদা মসজিদ ও নয়গম্বুজ মসজিদ, খানজাহানের সমাধিসৌধ, জিন্দাপীরের মাজার ও মসজিদ ও রণবিজয়পুর মসজিদ।

ধর্ম প্রচারক ও খলিফাতাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা খানজাহান (রঃ) ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আক্টোবর ৯০ বছর বয়সে মারা যান। পরে তাকে খাঞ্জেলী দিঘির উত্তর পাড়ে সমাহিত করা হয়।

শওকত আলী বাবু/এফএ/জিকেএস