‘জমি-ঘর পেয়েও আগের অবস্থায় ফিরে গেছি’
নিজের সম্পত্তি বলে কিছুই ছিল না মোকছেদ আলীর। অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকতেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়েই তার সংসার। গ্রামীণ সড়কে চালাতেন রিকশা। তাও ভাড়া নিয়ে। এভাবে প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় হতো তা দিয়েই সংসারের সব খরচ মেটাতেন তিনি। স্বপ্ন ছিল একদিন জমি কিনবেন। সেখানে ঘর তুলবেন। মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই হবে। কিন্তু স্বল্প আয়ে সংসারের খরচ মিটিয়ে সেই স্বপ্ন ধরা দিচ্ছিল না মোকছেদ আলীর। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের জমি ও ঘর তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেয়।
গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে’র ঘর পেয়েছেন মোকছেদ আলী। সেই ঠিকানায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠেন। শুরু করেন নতুন সংসার। কিন্তু দুইদিনের বৃষ্টিতেই তার বাড়িটির একাংশ ধসে খালে পড়ে যায়। এছাড়া বাড়ির বাকি অংশও ধসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পাশের ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন মোকছেদ আলী।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের খানপুর বুরিগাড়ি খালের কিনারায় গড়ে তোলা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আশ্রয়ণ-২ এর আওতায় জমি-ঘর পাওয়া সুবিধাভোগী মোকছেদ আলী অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে বলছিলেন এসব কথা।
তিনি বলেন, ‘জমি-ঘর পেয়েও এখন নাই। বলা চলে আগের অবস্থায় ফিরে গেছি। এখন পরিবার নিয়ে খুব কষ্টের মধ্যেই দিনাতিপাত করছি।’
একইভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরেক সুবিধাভোগী রহমত আলী বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল নতুন ঘরে উঠব। কিন্তু পারলাম না। বর্ষা মৌসুমের অব্যাহত বৃষ্টির কারণে খালের পানি বাড়ছে। যেকোনো সময় ঘরের মধ্যে পানি উঠবে। অথবা বাড়ির নিচের অংশের মাটি ধসে পড়বে। তাই আতঙ্কে বাড়িটিতে থাকছি না।’ আগের নলবাড়িয়া খাসপাড়ার বাড়িতেই থাকছেন বলে জানান তিনি।
আরেক সুফলভোগী শেফালী বেগম বলেন, ‘আমাদের মতো ভূমিহীনদের একটি করে বাড়ি উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু নতুন বাড়িতে উঠতে পারছি না। বসবাস শুরুর আগেই তার বাড়ির একটি ঘর ছাড়া সবই ভেঙে পড়েছে। বাকি ঘরটির দেয়ালেও ফাটল ধরেছে। এটিও যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তাই এখন কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’
এসব ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে খালের কিনারায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সেই খাল থেকে মাটি কেটে বাড়ির চারপাশে দেয়া হয়েছে। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই মাটি খালে ধসে যাওয়ায় ঘরগুলোর এই হাল হয়েছে। এছাড়া ঘর তৈরিতেও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ সুবিধাভোগীদের।
সুবিধাভোগীরা জানান, ঘরগুলো হস্তান্তরের শুরু থেকেই বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়নি। নেই বিদ্যুতের সংযোগও। এই অবস্থায় ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে গোটা আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায়। এসব কারণেই প্রকল্পের ২২টি পরিবারের মধ্যে মাত্র আট পরিবারের লোকজন ঘরে উঠেছেন। কিন্তু দুইদিনের বৃষ্টিতে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ঘর ধসে পড়ায় সুবিধাভোগীদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীনদের জন্য সরকারিভাবে আধাপাকা বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে অনুযায়ী শেরপুর উপজেলায় দুই কোটি ৮৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে দুই শতক করে খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়ে উপজেলার আটটি ইউনিয়নে অতিদরিদ্র ১৬৩টি ভূমিহীন পরিবারকে একটি করে বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হয়। দুই কক্ষ, রান্না ঘর ও টয়লেটসহ প্রধানমন্ত্রীর উপহারের প্রত্যেকটি বাড়ি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
এরই ধারাবাহিকতায় খানপুর ইউনিয়নের খানপুর বুড়িগাড়ি নামক স্থানে খালের কিনারায় ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২২টি ভূমিহীন পরিবার পুনর্বাসনের জন্য আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ করা হয়।
পরবর্তীতে সুফলভোগীদের হাতে এসব বাড়ির জমির দলিল ও চাবি হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু পাঁচ মাস যেতে না যেতেই বর্ষা মৌসুমের টানা দুইদিনের বৃষ্টিতে আটটি ঘর ভেঙে পড়ে।
বুধবার (৭ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার খানপুর বুড়িগাড়ি এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বাড়ির পেছন পাশের মাটি খালে ধসে পড়ছে। খালটিতে বাঁশের পাইলিং করে প্রকল্পের বাড়িগুলো রক্ষার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে ধসে যাওয়া ঘরগুলো রক্ষার জন্য পাশেই অবস্থান করছেন সুবিধাভোগী হায়দার আলী, আব্দুল কাদের, বাদশা মিয়া, শেফালী বেগম, নদীয়ার চাঁদ, মোকছেদ আলী, সোনা উদ্দিন ও গোলাপী বেগম।
এ সময় তারা বলেন, ‘যেকোনো সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো ভেঙে পড়তে পারে। কারণ খালটির কিনার ঘেঁষে এসব ঘর বানানো হয়েছে। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই একপাশের মাটি ধসে ঘরগুলো ভেঙে যাচ্ছে। তাই ভাঙন আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘ঘরগুলো রক্ষায় সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) স্যার সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। তার নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে বুড়িগাড়ি খালের তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও খালের ধারে গাইড ওয়াল তৈরি করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো পুনর্নির্মাণ কাজ চলছে। তাই এখানে বসবাসকারী সুবিধাভোগীদের আর কোনো সমস্যা হবে না।’
জেডএইচ/জেআইএম