হিরুরা এবার ঈদ করবেন নিজ বাড়িতে
পাকা বাড়ি, পাকা নলকূপ, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সুবিধা পেয়েছেন প্রতিবন্ধী হিরু (৪৫)। তিনি এখন গোসল সেরে বারন্দায় বসে আয়েশ করে পায়েশ কিম্বা কাঁঠাল মুড়ি খেতেই পারেন। তার, স্ত্রী ও সন্তানের মুখে এখন হাঁসির বান ডেকেছে। অন্যের বাড়িতে করুণার পাত্র হয়ে না থেকে এবার নিজ বাড়িতে ঈদ করবেন হিরু।
পাবনার সাঁথিয়ায় হিরুসহ ৪২২ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাকা ঘর পেয়ে খুশি। কেউ কেউ জীবনের প্রথম আবার কেউ বিয়ের পর প্রথম নিজ বাড়িতে কুরবানি ঈদ করতে যাচ্ছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের তেঁথুলিয়া দত্তপাড়ায় দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, হতদরিদ্র মানুষগুলো নতুন করে বাঁচতে শিখেছেন। ভালো আছেন। তাদের পাকা ঘরগুলোও ভালো রয়েছে।
এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একজন হলেন প্রতিবন্ধী হিরু। তাকে নিয়ে জাগো নিউজে গত জানুয়ারিতে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। তখন সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ জানিয়েছিলেন, হিরুকে পাকা ঘর করে দেয়া হবে। ছয় মাস পর হিরুকে পাওয়া গেল প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে পাওয়া তার নিজ বাড়িতে। হিরু তখন কেবল তার ছোট্ট মুদি দোকান (টং দোকান) থেকে বাড়ি এসে গোসল করছিলেন। পাকা নলকূপের পাশে বসে বেশ খুশি মনে গায়ে পানি ঢালছিলেন তিনি। এরপর বারান্দায় বসে দুপুরের খাবার খান বেশ মজা করে। ঈদ উপলক্ষে ঘরে নতুন টেলিভিশনও এনেছেন। এখন বেশ স্বাচ্ছ্যন্দেই দিন কাটছে তার।

সাঁথিয়ার তেঁতুলিয়া আরেকটি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে কথা হয় রহমান প্রাামনিকের (৬২) সঙ্গে। তিনি জানান, ঠিকানা রুদ্রগাতি গ্রাম থাকলেও বাড়ি ছিল না। সেচ প্রকল্পর ডাইকের পাড়ে থাকতাম। এখন অনেক ভালো আছি। এবার নিজের বাড়ি ঈদ করবো বলে আনন্দ অনেক বেশি। আরেক গৃহবধূ হাঁসি খাতুন (৩০) জানালেন, স্বামী শাহজাহান আলী ভ্যান চালান। ছেলেসহ তারা এক জায়গায় ভাড়া থাকতেন। নিজের বাড়িতে উঠে এখন খুশি।
তবে তিনি জানান, আশ্রয়নের বাড়ি থেকে যে সংযোগ সড়ক আছে সেটা কাঁচা। যার জন্য স্বামী ভ্যান আনতে পারেন না। এ সড়কটুকু পাকা হলে খুব উপকার হতো।

এখানে বসবাসরত আরেক ভ্যানচালক নূর ইসলাম বলেন, আশ্রয়নে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের বাড়ি পেয়েছি। সব দিক দিয়ে ভালো আছি। কিন্তু রাস্তাটি কাঁচা। ফলে বর্ষায় ভ্যান বাড়ি পর্যন্ত নিতে পারেন না। এ সমস্যার সমাধান হলে আর কোনো কষ্ট নেই।

৭৫ বছরের অশীতিপর বৃদ্ধ লোহাই মণ্ডল তার বৃদ্ধ স্ত্রী সাহারা খাতুনকে নিয়ে উঠেছেন আশ্রয়ণের ঘরে। এ দম্পতি জানান, সন্তানরা খরচ দিত না। তাই পেটের তাগিদে সন্তানদের কাছেই নিজেদের শেষ সম্বল বাড়িটুকু বেচে দিয়েছি।
সাহারা খাতুন দুপুরের রান্না করছিলেন। তিনি জানালেন, পুত্রবধূদের কত কথা শোনা লাগত। এখন অন্তত নিজের বাড়িতে থাকতে পারছি। কারও কটু কথা শোনা লাগে না।

পাশেই থাকা মতাজ বেওয়া জানালেন, জীবনে কত কষ্ট করেছি। পরের বাড়ি, পরের ভাঙা ঘরে থাকতাম। ঘর দিয়ে পানি পড়তো। এখন পাকা ঘর পেয়েছি। অনেক শান্তিতে আছি।
তেঁথুলিয়ায় পাকা সড়কের ধারে তৈরি আশ্রয়ণের বাসিন্দারের একজন প্রতিবন্ধী হিরুর প্রতিবেশী শিলা রাণী (২৫) বলেন, বিয়ের পর থেকে ক্যানেলের ডাইকে স্বামীকে নিয়ে থাকতাম। এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে পাকা বাড়িতে উঠেছি। এজন্য বেজায় খুশি।
তিনি আরও জানান, এখানে এখন নলকূপ সমস্যা। আরও ২-৩টা নলকূপ হলে ভালো হতো। এখানে বসবাস করা অনেকের সঙ্গে কথা বলে এবং আশ্রয়ণ এলাকা ঘুরে কোথাও ওয়াল ফাটা বা ধসে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়নি।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম জামাল আহমেদ জানান, গৃহহীনদের ঘরের ব্যবস্থা করে প্রধানমন্ত্রী যে মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন তেমন উদ্যোগ বিশ্বে বিরল।
তিনি আরও বলেন, সেখানে বসবাসরতদের জন্য সুসংবাদ হলো যেসব প্রকল্পের সঙ্গে পাকা সংযোগ সড়ক নেই সেখানে রাস্তা পাকা করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া খুব দ্রুতই নলকূপ সংখ্যা বাড়ানো হবে। এটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। দ্রুততার সঙ্গে সরকারের সব নির্দেশ মেনে ঘরগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে।
আমিন ইসলাম জুয়েল/এএইচ/এমএস