ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

একমাস পর মাংস খাবে খাদিমুল

জেলা প্রতিনিধি | কুড়িগ্রাম | প্রকাশিত: ০৩:৪২ পিএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২২

একমাস ধরে মুন্সিগঞ্জে আলুক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে তিনদিন আগে বাড়িতে এসেছেন শাহালম। দীর্ঘদিন পর বাবা ফিরে আসায় মাংস খাওয়ার বায়না ধরেছে ছেলে খাদিমুল (৮) ও খায়রুল (৫)। তাই দিনমজুর বাবা সন্তানদের সাধ পূরণে চরপার্বতীপুর এলাকা থেকে নৌকাযোগে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে এসেছেন ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপুরহাটে। উদ্দেশ্য ব্রয়লার মাংস কিনবেন।

মাংসের পাশাপাশি কিনেছেন মাংস রান্নার উপকরণসহ খোলা বিস্কুট। সেগুলো কাঁধে নিয়েছে ছেলে খাদিমুল। বাবা শাহালম মাথায় নিয়েছেন হাটে বিক্রি না হওয়া প্রতিবেশীর বাদাম। একমাস পর মুখে উঠবে মাংস, সেই ক্ষণের আশায় তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে শিশু খাদিমুল ও খায়রুল।

শাহালমের বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চরপার্বতীপুর এলাকার ব্রহ্মপুত্রবিধৌত দ্বীপ চরে। মঙ্গলবার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে যাত্রাপুরহাট-সংলগ্ন বাঁধে এমন চিত্র দেখা যায়।

যাত্রাপুর হাটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রাপুর ইউনিয়নের চরপার্বতীপুর এলাকার ব্রহ্মপুত্রবিধৌত দ্বীপ চরে শাহালমের পরিবারের মতো আরও ১০-১২ পরিবারের বসবাস। শাহালমরা যে চরে থাকেন সে চরটি ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে চরপার্বতীপুর থেকে ভেঙে আলাদা হয়েছে। খণ্ডিত এই দ্বীপ চরে বসবাসরত পরিবারগুলো নানা ভোগান্তির শিকার। পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে ভোগান্তি নিয়ে সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে যাত্রাপুরহাটে আসতে হয়।

jagonews24

শুধু চরপার্বতীপুর নয়, চরপার্বতীপুর ছাড়াও জেলার ভগবতীর পুর, ইটালুকান্দা, ফকিরের চর, দৈ খাওয়া, আইরমারী, সাহেবের আলগা, জাহাজের আলগা, ঝুনকার চর, কালির আলগা, রলাকাটাসহ কয়েক ডজন চরের মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে আসতে হয় যাত্রাপুরহাটে। শাহালমের মতো এসব এলাকার মানুষও ভোগান্তি নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে এই হাটে আসেন।

এসব চরাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই খেটে-খাওয়া, নিম্নআয়ের সুবিধাবঞ্চিত। এসব এলাকার মানুষের সাধ জাগলেও সাধ্য থাকে না। ইচ্ছে করলেই মাংস কিনে খেতে পারেন না। একদিকে এদের বসবাস যোগাযোগবিচ্ছিন্ন চর কিংবা দ্বীপ চরে। অন্যদিকে ওসব এলাকায় নেই কোনো হাটবাজার। ছোট পরিসরে বাজার থাকলেও পাওয়া যায় না চাহিদামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এ কারণ চরাঞ্চলের মানুষগুলো যাত্রাপুর হাটের ওপর নির্ভরশীল।

এসব অঞ্চলের খেটেখাওয়া ও নিম্নআয়ের মানুষ সাধ্য অনুযায়ী কেউ এক সপ্তাহ পরে, কেউ দুই সপ্তাহ পরে এমনকি একমাস পরেও মাংস কিনে খান। তবে বেশিরভাগই ব্রয়লার মাংস কিংবা ব্রয়লার মুরগি কেনেন। তবে গরুর কিংবা খাসির মাংস কিনে খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের।

শাহালমের প্রতিবেশী ও যাত্রাপুরহাটের মুদিদোকানি ইয়াকুব আলী জাগো নিউজকে বলেন, শাহালম এমনই এক এলাকায় বসবাস করেন যেটি চরপার্বতীপুরের মূল ভূখণ্ড থেকে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের শিকার হয়ে বিচ্ছিন্ন একটি চরে পরিণত হয়েছে। যেখানে গুটি কয়েক পরিবারের বসবাস। পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন এলাকায় থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক সেবা থেকে প্রায় বঞ্চিত। এদের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। ওই এলাকায় স্কুল নেই।

jagonews24

তিনি আরও বলেন, শাহালমের ছেলে দুটিও শিক্ষাবঞ্চিত। শাহালমসহ ওই এলাকার সবাই দিনমজুর ও অভাবি। তিনবেলার খাবার জোটানোই মুশকিল।

কথা হয় শাহালমের ছেলে খাদিমুলের (৮) সঙ্গে। সে বলে, একমাস পর বাবা বাড়িতে এসেছেন। বাবা বাড়িতে না থাকায় মাংস খেতে পারিনি। তাই বাবার সঙ্গে দুই ভাই হাটে এসে মাংস কিনলাম। বাবার মাথায় বাদামের বস্তা। অনেক দিন পর আজ মাংস খাবো বলে খুবই আনন্দ লাগছে। আমার মাংস খেতে খুবই মজা লাগে।

দিনমজুর বাবা শাহালম জাগো নিউজকে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেকদিন কাজকর্ম জোটেনি। আর এই সময়টা চরাঞ্চলে খুবই অভাব দেখা দেয়। তাই কিছু টাকা আয় করতে মুন্সিগঞ্জে গিয়েছিলাম। সেখানে আলুর ক্ষেতে কাজ করেছি। সামান্য কিছু টাকা আয় হয়েছে। টাকা-পয়সা হাতে না থাকায় একমাস ধরে ছেলেদের মাংস খাওয়াতে পারিনি। বাড়িতে ফিরে আসায় তারা মাংস খাওয়ার বায়না ধরেছে। গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য তো নেই, তাই ব্রয়লার মাংস কিনে ছেলের হাতে দিয়েছি।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জাগো নিউজকে বলেন, এই সময়টিতে কাজকর্ম কম থাকায় অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে শোচনীয় হয়ে পড়েন। অনেক পরিবার অভাবগ্রস্ত থাকে। তাই অনেকেই দিনমজুরের কাজের জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাড়ি জমান।

মাসুদ রানা/এসআর/এএসএম