এনআইডিতে বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ১৯৭১, বন্ধ ভাতা
বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী ও তার জাতীয়পরিচয়পত্র
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় জাতীয়পরিচয়পত্রে সন্তান থেকে বাবার বয়স কম হওয়ায় দুবছর ধরে বন্ধ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য বিভিন্ন অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সুরাহা না পেয়ে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান ৯৪ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার চরভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ধুলার কুটি গ্রামের মৃত বাবন শেখের ছেলে মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী। প্রায় ৪৩ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সে সময় তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে যুদ্ধের আগে তিন সন্তান নিয়েছিল। মুক্তিবার্তা ও লাল বইয়ে তার নাম রয়েছে। তিনি ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়ে আসছিলেন।
২০২০ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য অনলাইনে পূরণ করতে গিয়ে তিনি জন্ম তারিখের ত্রুটির কারণে তার ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। জন্ম সনদ অনুযায়ী তার বয়স ১৯২৮ সালের ১১ আগস্ট। কিন্তু ২০০৮ সালে জাতীয়পরিচয়পত্রে তার বয়স দেখানো হয়েছে ১৯৭১ সালের ১০মে। অথচ তার বড় ছেলে আমির হোসেনকে তার থেকে বড় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বাবার থেকে ছেলে বড়। জাতীয়পরিচয়পত্রে বড় ছেলে আমির হোসেনের বয়স দেখানো হয় ১৯৬০ সালের ২ মার্চ। জাতীয়পরিচয়পত্রের এমন ত্রুটির কারণে দুবছর থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধ রয়েছে।
জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য নির্বাচন অফিসসহ বিভিন্ন বিভাগের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি আকবর আলীর সন্তানদের। জন্ম তারিখ সংশোধন হওয়ার আগেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী গত ৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হযরত আলী বলেন, আমিসহ আকবর আলী ও লস্কর আলী জেঠাতো ভাই। তিনজনই যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পেয়েছি। কিন্তু হঠাৎ ভোটার আইডির সমস্যা হওয়ায় আকবর আলীর ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলীর স্ত্রী সুফিয়া বেওয়া বলেন, ভাতা বন্ধ হওয়ার পর থেকে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসাও ঠিকমতো করতে পারলাম না। অসুস্থতার কারণে উনি মরেই গেলেন। আমরা অফিস-আদালতে অনেক দৌড়াইছি। কেউ সাড়া দেয় নাই।
বড় ছেলে আমির হোসেন বলেন, জাতীয়পরিচয়পত্র করার সময় বাবার বয়স দেওয়া হয়েছে ১৯৭১ সাল। আমাদের ভাই-বোনদের অনেকের বয়স দেওয়া হয়েছে ১৯৫০, ১৯৬০ এমন অনেক সমস্যা করেছে। এই জন্ম তারিখ ঠিক করার জন্য যেখানেই গেছি খালি ট্যাহা-ট্যাহা করে। তাও আমগো বাবার জন্ম তারিখ ঠিক হয়নি। আমরা ব্যর্থ হয়া গেছি।
আকবর আলী নাতি রঞ্জু বলেন, ২০০৮ সালে আমার দাদা-দাদি এনআইডি করতে যায়। সেখানে তাদের বয়স ভুল তোলা হয়েছে। তারা তো মূর্খ মানুষ। বয়স কী এগুলো বোঝেন না। দাদার বয়স ঠিক করতে আমরা ঢাকা গেছি। সেখানে বলা হয় আমরা পারবো না, এটা রংপুর থেকে ঠিক করবে। রংপুরে গেছি, সেখানে আমরা পাত্তাই পাই না। বহু টাকা পয়সা খরচ করেও কোনো লাভ হয়নি। দাদা মারাই গেলো। তবু ভাতা চালু হয়নি আজও। এখন অন্যের ভুলের খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার জামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, মরহুম আকবর আলী প্রকৃত একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বয়স ঠিক করার জন্য আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেন হলো না তার সঠিক কারণ আমরা জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি সঠিক তদন্ত করে মৃত আকবর আলীর ভাতা পুনরায় চালু করে দিতে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম রাকিব জাগো নিউজকে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলীর জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদনটি বিবেচনা করে ‘গ’ ক্যাটাগরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা জিএম সাহাতাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমি ঢাকায় মিটিং শেষ করে রংপুর ফিরছি। বিষয়টি আমার জানা থাকলো। আমি যত দ্রুত সম্ভব সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করবো।
মাসুদ রানা/এসজে/এএসএম