ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

নওগাঁয় ট্রাস্টের জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ

জেলা প্রতিনিধি | নওগাঁ | প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

নওগাঁর বদলগাছীতে আনন্দ মার্গ শিক্ষা, ত্রাণ ও জনকল্যাণ ট্রাস্টের জমিতে ভূমি ও গৃহহীন পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণের কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের সাদিশপুর গ্রামে ২৮টি গৃহ নির্মাণ করছে উপজেলা প্রশাসন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দাবি জায়গাটি খাস করা হয়েছে।

এদিকে ঘর নির্মাণকাজ বন্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর ট্রাস্টের সভাপতি লিখিত আবেদন করলেও অজ্ঞাত করণে নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৪ সালে উপজেলার সাদিশপুর গ্রামের শিক্ষা অনুরাগী প্রভাস চন্দ্র দাস আনন্দ মার্গ শিক্ষা, ত্রাণ ও জনকল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। পৈত্রিক ১৭ দশমিক ২৬ একর জমি ট্রাস্টের নামে দান করেন তিনি। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ছয়জন শিক্ষকসহ ৭৬ শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া ট্রাস্টের অর্থায়নে প্রতি শুক্রবার একজন চিকিৎসক এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশ নেয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সূত্র জানায়, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য তৃতীয় পর্যায়ে ৪৬টি ঘর বরাদ্দ আসে। এরমধ্যে ২৮টি ঘর সাদিশপুর মৌজার ওই ট্রাস্টের জমির ১ একর ১৫ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলপনা ইয়াসমিন এসব ঘর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

নওগাঁয় ট্রাস্টের জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ

বিষয়টি জানার পর ট্রাস্টের সভাপতি সুশীল চন্দ্র মণ্ডল গত ৬ জানুয়ারি ইউএনওর কাছে ট্রাস্টের জমিতে ঘর নির্মাণের কাজ বন্ধের জন্য আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অফিসে আসতে বলা হলে ইউএনওর সঙ্গে দেখা করেন ট্রাস্টের সভাপতিসহ কমিটির অন্য সদস্যরা। ইউএনও কাগজপত্র দেখে ডিসির আদেশে জমিগুলো খাস হয়েছে এবং আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের আদেশ না আনা পর্যন্ত ঘর নির্মাণ চলবে বলেও জানান তিনি।

ট্রাস্ট ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাদিশপুর, উত্রাসন ও চকমোহনপুর মৌজার ১৭ দশমিক ২৬ একর জমির মূল মালিক কৃষ্ণ কুমার দাস। তার দুই ছেলে গিরিশ চন্দ্র দাস ও জ্যোতীশ চন্দ্র দাস। জ্যোতীশ চন্দ্র দাসের দুই ছেলে মনিন্দ্র নাথ দাস ও ফনিন্দ্র নাথ দাস। তারা ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে আর দেশে ফিরেননি। ১৯৮৩ সালে জ্যোতীশ চন্দ্রের মৃত্যুর পর গিরিশ চন্দ্র দাস পৈত্রিক শরীক সূত্রে ওই জমির মালিক হন। গিরিশ চন্দ্রের মৃত্যুর পর তার ছেলে ক্ষিতীশ চন্দ্র দাস পৈত্রিক শরীক সূত্রে জমির মালিক হন। ১৯৭৪ সালে শত্রু সম্পত্তি আইন বিলুপ্ত হলে আব্দুল জব্বারসহ কতিপয় ব্যক্তি ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারা যোগসাজস করে ওই সম্পত্তি শুত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে একসনা লিজ নেয়। পরে ১৯৮৪ সালে ক্ষিতীশ চন্দ্র দাস নওগাঁ সদর মুনসেফ আদালতে নালিশি সম্পত্তিতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা করেন।

১৯৮৭ সালে তৎকালীন বদলগাছী উপজেলা সহকারী জজ আদালত দোতরফা শুনানি শেষে সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে নালিশি সম্পত্তিতে বাদীর স্বত্ব ও নিরঙ্কুশ দখল আছে বলে রায় দেন। তারপর আব্দুল জোব্বার ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ১৯৯১ সালে সহকারী জজ আদালত নওগাঁতে সরকারকে বাদী করে বাটোয়ারা মামলা করেন। ২০০৯ সালে সহকারী জজ আদালত নওগাঁ সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে মামলাটি খারিজ করে দেন। পরে আব্দুল জোব্বার এ রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ কোর্টে আপিল করেন।

২০১১ সালে যুগ্ম-জেলা জজ কোর্ট-১ নওগাঁ উক্ত আপিল মামলাটি দোতরফা শুনানি শেষে সেটি না মঞ্জুর করে দেন। কিন্তু যুগ্ম-জেলা জজ জ্যোতীশ চন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর ৩, ৪ নম্বর বিবাদী জীবিত আছেন। ফলে ছেলের বর্তমানে ভ্রাতুষ্পুত্রের ছেলে ১নম্বর বিবাদী কখনই হিন্দু আইনের বিধান মতে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইতে পারে না। ফলে উক্ত সম্পত্তি বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় অর্জন ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯২ ধারা মোতাবেক সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ রায়ের ফলে জেলা প্রশাসক নওগাঁ উক্ত সম্পত্তি খাস হিসেবে রেকর্ড করার আদেশ দেন।

নওগাঁয় ট্রাস্টের জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ

যুগ্ম-জেলা জজের রায় ও জেলা প্রশাসকের আদেশের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে প্রভাস চন্দ্র দাস উচ্চ আদালতে সিভিল রিভিশন দায়ের করলে রায় ও জেলা প্রশাসকের আদেশের বিরুদ্ধে রুল জারি করে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন। পরে ২০১৩ সালে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উক্ত রায় ও জেলা প্রশাসকের আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন উচ্চ আদালত।

ট্রাস্টের সভাপতি সুশীল চন্দ্র মণ্ডল বলেন, সরকার ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করছে সেটি নিঃসন্দেহে মহান উদ্যোগ। তবে তা কোনোভাবেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমিতে হতে পারে না।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুলর রহমান বলেন, জমি সিলেকশনের দায়িত্ব ইউএনওর। আমি শুধু ঘর বাস্তবায়ন করছি।

এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলপনা ইয়াসমিন বলেন, জমিগুলো খাস হওয়ায় ওই জমিতে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারদের পুনর্বাসন করার জন্য ২৮টি গৃহ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জমিগুলোতে আনন্দ মার্গ শিক্ষা, ত্রাণ ও জনকল্যাণ ট্রাস্ট নেই। তারা জাল দলিল তৈরি করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি বলে দাবি করছে।

আব্বাস আলী/আরএইচ/জেআইএম