সাফারি পার্কে প্রাণীর মৃত্যু: যেসব সুপারিশ করলো তদন্ত কমিটি
ফাইল ছবি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে ১১ জেব্রা ও একটি বাঘের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশ করেছে। ইতোমধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি ।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা দীপংকর বর জানান, তদন্ত কমিটির স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ গুলো হচ্ছে- সাফারি পার্কের বিভিন্ন প্রাণী/পাখির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও অধিকতর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল দ্রুত পদায়ন করা, সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণীর নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিং এবং বর্তমান ও অতীতের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মৃত্যুর কারণ, আক্রান্ত রোগসমূহ ও অন্যান্য বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য একজন ভেটেনারি এপিডেমিওলজিস্ট সাফারি পার্কে সংযুক্তি/পদায়ন করা, নিরাপত্তা কর্মী, অ্যানিমেল স্কাউট/এটেন্ডেন্টসহ তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী/ সংযুক্তি/পদায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য রাজস্বখাতে ১৩৮ পদের বিপরীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাণী খাদ্যের সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ, বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত ও স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য নিশ্চিত করার স্বার্থে পার্কে ভেটেরিনারি অফিসারকে প্রধান করে পদায়নকৃত ১ম শ্রেণি/২য় শ্রেণির কর্মকর্তার সমন্বয়ে ৪/৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী প্রাণী খাদ্য গ্রহণ কমিটি গঠন করা, প্রাণী ও পাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১০ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে প্রাণী শেড ও বিশ্রামাগার, খাবার পানি শোধন, কৃমি মুক্তকরণ, নিয়মিত টিকা প্রদান, পরিণত ও স্বাস্থ্যসম্মত ঘাস গ্রহণ। ঘাস গ্রহণের পর পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে চপার মেশিনে কেটে সরবরাহ করা, দানাদার খাদ্য ও সরবরাহকৃত মাংসের গুনগত মান যাচাই পূর্বক গ্রহণ, জেব্রার জন্য পৃথক বেষ্টনী নির্মাণ, সরবরাহকৃত শাকসবজি, ফলমূল ও ঘাস ধৌত করার চৌবাচ্চা নির্মাণ, নাইটভিশন সুযোগ সমৃদ্ধ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা। মুক্ত স্থানে ঘাস চাষ করা, সাফারি পার্কের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রক্ষার জন্য ডিজিটাল ডিভাইসে সবাইকে সংযুক্ত করা, পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মকর্তাসহ সমস্ত স্টাফদের নিয়ে প্রতিমাসে একবার সভা করা ও সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তাৎক্ষণিক সমাধান করা।
সাফারি পার্কে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান বন সংরক্ষককে লিখিতভাবে অবহিত করা। সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন। উক্ত কমিটি প্রতি দুই মাস পর পর সভা করে সাফারি পার্কের কার্যক্রম তদারকি করবে, সাফারি পার্কে ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ ভেটেরিনারিয়ানদের সমন্বয়ে একটি ভেটেরিনারি মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা।
যার মধ্যে কেন্দ্রীয় প্রাণী হাসপাতালের পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ হতে ভেটেরিনারি প্যাথলজি/মেডিসিন/ভেটেরিনারি সার্জারি বিভাগের একজন প্রতিনিধি, ডি আই এল থেকে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি অফিসার ও সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি অফিসার রাখা হবে।
মধ্য-মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- জরুরি প্রাণী-পাখির স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নের জন্য ওয়ার্ল্ড লাইফ ভেটেরিনারি হসপিটালে প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারি ওষুধ ও যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত মজুদ রাখাসহ হাসপাতালের অন্যান্য সুযোগ বৃদ্ধি করা। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক কিট-রি-এজেন্টসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংস্থান রেখে একটি ভেটেরিনারি মিনি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা। জরুরি প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ বা কমিটি প্রয়োজন মনে করলে দেশের অভ্যন্তর থেকে আরও ভেটেরিনারি এক্সপার্ট এবং ওয়ার্ল্ড লাইফ বায়োলজিস্ট সম্পৃক্ত করতে পারবেন। এমনকি প্রয়োজনে বিদেশ থেকে (সাউথ আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশ) এক্সপার্ট আনার ব্যবস্থা রাখা। সাফারি পার্কের মৃত প্রাণীর যথাযথ এন্টি মর্টাম এবং পোস্টমর্টাম পরীক্ষা আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা।
দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- সাফারি পার্কের অভ্যন্তরে রোগাক্রান্ত পশুকে চিকিৎসার স্বার্থে ভেটেরিনারি হাসপাতালে বা অন্যত্র (ঢাকা বা অন্য স্থানে) স্থানান্তরের জন্য একটি মোবাইল ভেটেরিনারি টিম রাখা। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সব কর্মকর্তাদের প্রাণী চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার জন্য দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা। প্রাণী স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার ওপর সমসাময়িক সময়ে জ্ঞান আহরণের জন্য ভেটেরিনারি চিকিৎসা সংক্রান্ত সব রেফারেন্স বইসহ (ভেটেরিনারি মেডিসিন, সার্জারি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, প্যারাসাইটোলজি ইত্যাদি) দেশী-বিদেশি জার্নাল সংগ্রহের মাধ্যমে একটি মিনি লাইব্রেরির ব্যবস্থা রাখা। প্রাণীর স্বাস্থ্য তদারকি ও ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল বোর্ডের সদস্যগণের প্রতি দুই মাস অন্তর বোর্ড মিটিংয়ের ব্যবস্থা রাখা। প্রতিটি বোর্ড মিটিংয়ে প্রকল্প পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপস্থিত থাকা। জরুরি ভিত্তিতে আকাশমণিসহ অপ্রয়োজনীয় বৃক্ষ অপসারণ করে বন্যপ্রাণী সহায়ক বাগান সৃজন, বন্যপ্রাণীর খাদ্যপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির ফুলবাগান সৃষ্টি করা। বেষ্টনী উন্নয়নের মাধ্যমে শিয়ালসহ বহিরাগত প্রাণীর প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। পার্কের অভ্যন্তরে যত্রতত্র গো-চারণ ও মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাফারি পার্ক চত্বরে ২৪ ঘণ্টা অবস্থানের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা রাখা এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা।
মো. আমিনুল ইসলাম/আরএইচ/জিকেএস