ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

পানি না পেয়েও বিল দিচ্ছেন ৬০ ভাগ পৌরবাসী

জেলা প্রতিনিধি | কুষ্টিয়া | প্রকাশিত: ১১:৩২ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

৪২ দশমিক ৭৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কুষ্টিয়া পৌরসভায় ৮৬ হাজার পরিবারের বসবাস। প্রায় আড়াই লাখ জনসংখ্যার পৌর এলাকার মোট হোল্ডিং সংখ্যা ৩৬ হাজার ৩০২টি। তবে কুষ্টিয়া পৌরসভার সাপ্লাই পানি উৎপাদন সরবরাহের সক্ষমতা মাত্র ১০ হাজার ৪শ ঘনমিটার। অর্থাৎ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মাত্র ১০ হাজার ৬৫৩ জন গ্রাহককে পানি সরবরাহ করতে পারে বা তাদের এই পরিমাণ গ্রাহককে পানি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।

এর বাইরেও তিন হাজার ৫শটি হস্তচালিত চাপকল, এক হাজার ৩৬৫টি সাবমার্র্সেবল মোটর এবং ২৮৯টি জেড টাইপ মোটরের (চাপকল বোরিংএ সাথে সংযুক্ত) অনুমোদন দিয়েছে পৌরসভা। এছাড়াও পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীরেকেই অবৈধভাবে আরও অন্তত সহস্রাধিক সাবমার্সেবল এবং জেড পাম্প চলছে।

কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম এসব তথ্য উপস্থাপন করে জানান, কুষ্টিয়া পৌরসভার বর্তমান যে সক্ষমতা তাতে পৌর এলাকার সব বাসিন্দাদের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাতে মাত্র ৪০ ভাগ গ্রাহকের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। মাত্র ৪০ ভাগ গ্রাহককে পানি সরবরাহ করলেও শতভাগ গ্রাহকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক পানির বিল আদায় করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

এ অবস্থায় পৌর কর্তৃপক্ষের এই আচরণকে চরম নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা আখ্যা দিয়ে এর প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন পৌর এলাকাধীন প্রায় অর্ধশত পৌর নাগরিক। কুষ্টিয়া সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক রাশেদুর রহমান অভিযোগটি আমলে নিয়ে আগামী ২০ এপ্রিল পৌর কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ মামলার বাদী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছেন মো. নওশের আলী দিং এবং বিবাদী করা হয়েছে কুষ্টিয়া পৌসভার মেয়র, নির্বাহী প্রকৌশলী, সচিব, সহকারী প্রকৌশলী (পানি) এবং মোকাবিলা বিবাদী করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসককে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ‘এজাহারকারীরা কুষ্টিয়া পৌরসভা কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ইস্যুকৃত বে-আইনি, ভুয়া, অকার্য্যকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হীন স্বার্থ চরিতার্থে এখতিয়ার বহির্ভুত ও পৌর নাগরিকদের উপর বাধ্যকর নয় এমন প্রায় দেড় শতাধিক স্মারক নংসহ সিল মোহরযুক্ত নোটিশের কপি সংযোজন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে কুষ্টিয়া পৌরসভা নাগরিকদের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহে সক্ষমতা বহির্ভুত এলাকার মানুষ জীবন ধারনের জন্য নিজ নিজ উদ্যোগে টিউবয়েল, সাবমার্সেবল বোরিং করে বাসাবাড়িতে পরিবার পরিজনের নিত্য এই পানি সংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। অথচ কুষ্টিয়া পৌরসভার পানি বিভাগের লোক দাবি করে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জন এসে নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পানির বোরিং বন্ধ করে অথবা অপসারণ করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করে আসছেন। কখনো আবার পৌরসভার সিল মোহরযুক্ত নোটিশ এনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে পানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এমন অন্যায় ও অবৈধ টাকা আদায়ের মাধ্যমে চরমভাবে তিক্ততা সৃষ্টিসহ বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে পৌর নাগরিক সমাজকে। তাই পৌর কর্তৃপক্ষের এই অন্যায় স্বেচ্ছাচারিতার বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মামলার বিবাদীগণ।’

কুষ্টিয়া উপজেলা সড়কের বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, পানি না দিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে তাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, পৌরসভার বর্তমান যে সক্ষমতা তাতে ৪০ ভাগ গ্রাহকের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে পৌর বিধিমতে, কুষ্টিয়া পৌর এলাকার যেখানেই বসবাস করেন না কেন গ্রাহকের পানি সেবা কর প্রদান করা বাধ্যতামূলক।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এসএম কাদরী শাকিল জানান, নতুন পানির সাপ্লাই লাইন, সাবমার্সেবল পাম্পসহ চাহিদা অনুযায়ী পানির লাইন নেওয়ার সময় একজন গ্রাহককে পৌর কর্তৃপক্ষকে এককালীন বৈধ ও অবৈধ সাড়ে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ক্ষেত্র বিশেষে ৮৭ হাজার টাকা করে প্রদান করা লাগে। অন্যথায় পানির লাইন বা সংযোগ পাওয়া যায় না। কিন্তু সব গ্রাহকের পানির চাহিদা পূরণ না করেই পৌরসভা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাদের কাছ থেকে মাসিক পানির বিল আদায় করে আসছে।

পানির সংযোগ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের এলাকা কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মীর রেজাউল ইসলাম বাবু গ্রাহককে পানি না দিয়েই মাসিক বিল আদায় করার কথা স্বীকার করে বলেন, আমাদের পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এখনও পর্যন্ত চাহিদার তুলনায় একেবারেই সামান্য। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে আমার এলাকার জনগণ পানি দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে থাকেন। এনিয়ে অনেকবার পৌর পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।

হোল্ডিংধারী প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পানির বিল গ্রহণ করার কথা স্বীকার করে কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী বলেন, কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় নাগরিক সেবার গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো পানি সরবরাহ। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি পূরণে ইতোমধ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন এলাকায় সাবমার্সেবল বোরিং স্থাপনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে শুষ্ক মৌসুমে শতভাগ না হলেও পৌর এলাকার একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পারিবারকে পানির যোগান দেওয়া সম্ভবপর হবে।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মৃনাল কান্তি দে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৌরসভা একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। স্থান-কাল বাস্তবতায় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে পৌর পরিষদের কিছু এখতিয়ার আছে। সেবা খাত বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে অবশ্যই তারা প্রতিকার চেয়ে আইন-আদালতের আশ্রয় চাইতে পারেন।

আল-মামুন সাগর/এফএ/এমএস