‘মানবকল্যাণে আমরা ঠকতে চাই’
বাজারমূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে নিত্যপণ্য দেবে ‘আইডিয়া লস প্রজেক্ট’
রমজান মাসে ব্যবসায় ‘ঠকতে’ মাঠে নেমেছে যশোরের আইডিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থা। ‘নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত’ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ‘আইডিয়া লস প্রজেক্ট’ যাত্রা শুরু করেছে। পুরো রমজান জুড়ে প্রায় ৫০০ পরিবারকে বাজারমূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছে সংগঠনটি।
‘মানবকল্যাণে আমরা ঠকতে চাই’ শ্লোগান দিয়ে মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) বিকেলে যশোর শহরের খড়কি এলাকার আইডিয়া পিঠাপার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্য বিক্রির মধ্যে দিয়ে এই লস প্রজেক্টের যাত্রা শুরু করেছে।
আয়োজকরা জানান, এই প্রোজেক্টের আওতায় পুরো রমজান মাসে প্রায় ৫০০ পরিবারের কাছে লোকসানে পণ্য বিক্রি করা হবে। পরিবারপ্রতি ৫০ টাকা কেজি দরের চাল ২৫ টাকায় পাঁচ কেজি, ১৬৮ টাকা লিটারের সয়াবিন তেল ১২০ টাকায়, দেড়শ টাকার খেজুর ৮০ টাকায়, ৩৫০ টাকা দরের খেজুর ২০০ টাকায়, ৪০ টাকা দামের ২ কেজি আলু ২০ টাকায়, ৫০ টাকার চিড়া ৩৫ টাকায়, ৮০ টাকা কেজির ছোলা ৫০ টাকায়, ৮০ টাকা কেজি দরের চিনি ৫০ টাকায়, ৯০ টাকা কেজি দরের মসুর ডাল ৬০ টাকায় এবং ৩০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ১৫ টাকায় দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ খেজুর দু’রকম হওয়ায় প্রতি প্যাকেজ ৫৫৫/৬৭৫ টাকায় দেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিক বাজার মূল্যে এই প্যাকেজের দাম ৯৪০/১১৪০ টাকা।
প্রতি পরিবার সপ্তাহে একবার করে চার সপ্তাহে মোট চারবার এই পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন। কেউ চাইলে প্যাকেজের সব পণ্য নিতে পারবেন আবার পছন্দমতোও কিনতে পারবেন। সব মিলিয়ে আইডিয়া রমজান মাসের এই প্রজেক্টে তিন লক্ষাধিক টাকা ভর্তুকি দিয়ে লস করতে যাচ্ছে।
আইডিয়া লস প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর হারুণ অর রশিদ জানান, আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত সমাজকল্যাণমূলক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এই প্রজেক্টের আওতায় শিক্ষার্থীরা পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ‘লস’ করার উদ্দেশ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর ব্যবসা করছেন। সহজ কথায়, তারা বেশি দামে পণ্য কিনে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মাঝে কম দামে বিক্রি করছেন। এভাবে পুরো রমজান মাসজুড়ে এলাকার নির্দিষ্ট ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্তের’ মাঝে লসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিক্রি করতে করতে ঈদের আগের সপ্তাহে তাদের মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং ‘লস প্রজেক্টের’ সমাপ্তি ঘটবে।

আইডিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা যশোর সরকারি এম এম কলেজের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম দেশেই রমজান মাস আসলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমে। কিন্তু বাংলাদেশে বাড়ে। রমজানে সংযম ও আত্মশুদ্ধির সব শিক্ষা ভুলে গিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারির মাধ্যমে সীমাহীন ‘লাভের লোভ’ই এর জন্য দায়ী। এ সংকটের নির্মম শিকার সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা।
তিনি বলেন, নিম্নবিত্তের মানুষেরা সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন ‘ত্রাণ’ সুবিধার জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে পারলেও চক্ষু লজ্জার খাতিরে ‘মধ্যবিত্ত’ তাদের কান্না লুকিয়েই রাখে। ‘আইডিয়া লস প্রোজেক্ট’ পরোক্ষভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সহনশীলতার মধ্যে নিয়ে আসার একটি প্রকল্প।
সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা ‘লস’ করবে সমাজের লাভের জন্য। আর সমাজটা আমাদের সবার। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি- যারা কারও কাছেই হাত পাততে পারে না, আবার কারও অনুদানও গ্রহণ করতে লজ্জাবোধ করেন, তাদেরকে সসম্মানে ক্রয় ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ‘লস’কে সাদকাহ হিসেবে বিবেচনা করবেন। ইহকালের লস, তাই পারলৌকিক ‘লাভ’!
কো-অর্ডিনেটর হারুণ অর রশিদ আর জানান, এই লস প্রজেক্ট আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থার দ্বারা পরিচালিত হবে। শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত আইডিয়া পিঠাপার্কের ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশের অর্থ আর্ত-মানবতার সেবায় ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সুহৃদ এই প্রজেক্টে অংশ নিচ্ছেন। এ সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলে মানবতার কল্যাণের এই সুখের অংশ হতে পারেন।
মঙ্গলবার বিকেলে আইডিয়া থেকে পণ্য কেনা শহরের খড়কি এলাকায় নিম্নআয়ের ইলিয়াস হোসেন ও গোলাম মোস্তফা জানান, বাজারে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। এখানে অনেক কম দামে কিনতে পারছি। পুরো রমজান মাসে এই দামে জিনিস কিনে শান্তিতে থাকতে পারবো।
সন্দীপণ স্কুল এলাকার বাসিন্দা শাহনাজ খাতুন জানালেন, টানাটানির সংসারে রমজান মাস কীভাবে পার করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। সেই সময় এই সংস্থা থেকে এভাবে কম দামে জিনিস কেনার সুযোগ দিলো। এই সুযোগ আমাদের মতো গোনা টাকায় সংসার চালানো মানুষের অনেক উপকার করবে।
মিলন রহমান/এমআরআর/এএসএম